ব্যবসায়িক প্রতারণায় ফৌজদারি মামলার পথ খুলল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৩ বার
ব্যবসায়িক প্রতারণায় ফৌজদারি মামলার পথ খুলল

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্যবসায়িক লেনদেন, অংশীদারি চুক্তি কিংবা কোনো বাণিজ্যিক সমঝোতার আড়ালে শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ থাকলে সেটিকে শুধু দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এ ধরনের ঘটনায় দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি বিচার কার্যক্রমও চলতে পারে বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগের বিচারিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে তাৎপর্য তৈরি করেছে।

‘মো. শাহ আলম বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতি মো. বজলুর রহমান এবং বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়েরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। পরে রোববার ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন, কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা অংশীদারির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ ফৌজদারি বিচারের বাইরে চলে যাবে—এমন ধারণার সুযোগ নেই।

মামলাটির সূত্রপাত রাজধানীর মিরপুর রোডের গাউছিয়া মার্কেটের একটি দোকানকে কেন্দ্র করে। মামলার নথি অনুযায়ী, দোকানটির মালিক ছিলেন শাহ আলম। সেখানে অংশীদারি লভ্যাংশ দেওয়ার শর্তে কাপড় ব্যবসায়ী মো. জাহিদ খান ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দোকানটি জাহিদের কাছে বিক্রির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। দোকানটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক কোটি সাত লাখ টাকা।

ওই সমঝোতার ভিত্তিতে জাহিদ খান বিভিন্ন সময়ে মোট ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পর দোকানটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে শাহ আলম টালবাহানা শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি পরে দোকান মালিক সমিতির সালিশে গড়ায়। সেখানে জাহিদের পাওনা অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে মামলার বিবরণে বলা হয়েছে।

তবে পরবর্তী সময়ে শাহ আলম সম্পূর্ণ টাকা গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং এমনকি ওই চুক্তির অস্তিত্ব নিয়েও আপত্তি তোলেন বলে অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে জাহিদকে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনার পর জাহিদ খান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে শাহ আলমের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন।

প্রাথমিক তদন্ত ও শুনানি শেষে একই বছরে শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। এর পর ওই আদেশ ও মামলার কার্যক্রম বাতিলের আবেদন নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন শাহ আলম। ২০২৪ সালে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারার অধীনে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।

হাইকোর্টে তাঁর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ, অংশীদারি চুক্তি কিংবা চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির। এ ধরনের বিরোধে ফৌজদারি আইনের প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনে বিচার চালানোর সুযোগ নেই। এ যুক্তির পক্ষে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তও তুলে ধরা হয়।

আবেদনটির শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট অধস্তন আদালতের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন এবং রুল জারি করেন। পরবর্তীতে মামলার চূড়ান্ত শুনানির সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়িক চুক্তির শুরু থেকেই যদি প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য থাকে এবং সেই উদ্দেশ্যে অর্থ গ্রহণ করে তা আত্মসাৎ করা হয়, তাহলে ঘটনাটি শুধু চুক্তি ভঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ফৌজদারি অপরাধের উপাদান তৈরি করতে পারে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এ বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক নজিরও আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তি ছিল, একই ঘটনায় দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অপরাধের উপাদান থাকলে ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় আইনগত বাধা নেই। কারণ দেওয়ানি প্রতিকার এবং ফৌজদারি দায়—দুটি ভিন্ন আইনি প্রশ্ন।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আদালত বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারায় কোনো মামলা বাতিলের আবেদন বিবেচনার সময় আদালত মূলত নালিশি দরখাস্তে করা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি বিচার করেন। ওই পর্যায়ে মামলার সব তথ্য-প্রমাণের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা আদালতের কাজ নয়।

এই মামলায় নালিশি দরখাস্তে অংশীদারি চুক্তির শুরু থেকেই প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য, অসৎ অভিপ্রায় এবং পরবর্তীতে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বলে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে ঘটনাটিকে কেবল একটি দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে আদালত মনে করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, শাহ আলম প্রকৃতপক্ষে দোকানটির মালিক ছিলেন কি না, তিনি জাহিদের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছিলেন কি না কিংবা চুক্তির শর্ত কী ছিল—এসব বিষয় প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের বিতর্কিত বিষয় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। মামলা বাতিলের পর্যায়ে হাইকোর্ট এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারেন না।

অধস্তন আদালত শাহ আলমের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী অভিযোগ গঠন করেছে এবং ওই অভিযোগ বিচার পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কি না, সেই প্রশ্নও মামলার নথির আলোকে বিবেচনা করা হয়েছে। হাইকোর্ট মনে করেছেন, অভিযোগের মধ্যে বিচার চালিয়ে যাওয়ার মতো উপাদান রয়েছে। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করে মামলাটি বাতিল করার প্রয়োজন নেই।

রায়ে আদালত মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদনের পর কোনো পক্ষ প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় না। কিন্তু চুক্তির শুরুতেই যদি প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকে, মিথ্যা তথ্য বা অসৎ কৌশলের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা ঘটে, তাহলে অপরাধের অভিযোগের বিচার ফৌজদারি আদালতে চলতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণ ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অংশীদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুক্তি, অর্থ পরিশোধ, মালিকানা হস্তান্তর ও অংশীদারির শর্ত নিয়ে বিরোধ প্রায়ই তৈরি হয়। এসব বিরোধের অনেক ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেওয়া হয়। তবে কোনো বিরোধের পেছনে শুরু থেকেই প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যের অভিযোগ থাকলে সেটিকে শুধু ব্যবসায়িক মতবিরোধ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—হাইকোর্টের রায়ে সেই নীতিই প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে এই রায়কে এমন অর্থে নেওয়ার সুযোগ নেই যে, প্রতিটি ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গের ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করা যাবে। চুক্তি ভঙ্গ, পাওনা টাকা পরিশোধ না করা বা ব্যবসায়িক মতবিরোধের প্রতিটি ঘটনা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে প্রতারণা, অসৎ উদ্দেশ্য, অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের মতো অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান অভিযোগ ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

মো. শাহ আলমের মামলায়ও হাইকোর্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করেননি। বরং মামলাটি কেবল দেওয়ানি বিরোধের অজুহাতে বাতিল করা যাবে না এবং অভিযোগের বিচার চলতে পারে—এই আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করেছেন। মামলার অভিযোগ সত্য কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে হয়েছিল, তা পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।

ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ব্যবসায়িক লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিচারিক অবস্থান আরও পরিষ্কার হলো। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলায় অভিযোগের প্রকৃতি নির্ধারণ এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত