প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। সবকিছু ঠিক থাকলে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফর হতে যাচ্ছে। সফরটি ঘিরে ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অধিবেশনের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও সাইডলাইন কর্মসূচিতেও অংশ নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসূচি, বৈঠক ও অন্যান্য কর্মসূচির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবারই প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। ফলে তাঁর এ সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিনিময় ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
জানা গেছে, জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে আপাতত অন্য কোনো দেশ সফরের পরিকল্পনা নেই প্রধানমন্ত্রীর। সফরসূচি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি নিউইয়র্কে তাঁর অবস্থানকালে সম্ভাব্য বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। অধিবেশনের মূল পর্বের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর হওয়ায় তাঁকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। নিউইয়র্কে বড় পরিসরে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সফরকেন্দ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে নেতাকর্মীদের নিউইয়র্কে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে ঘিরে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাংগঠনিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।
উত্তর আমেরিকা বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক অবস্থানকালে স্বাগত কর্মসূচি, জনসংযোগ ও বিভিন্ন সমাবেশের আয়োজন করা হতে পারে। এর মধ্যে জাতিসংঘ ভবনের সামনে বড় ধরনের শান্তি সমাবেশের প্রস্তুতির কথাও এসেছে। কর্মসূচিতে ব্যাপকসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সফরের সময়কাল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে তাঁর ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে দুদিনের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সব কর্মসূচি চূড়ান্ত হলে পুরো যুক্তরাষ্ট্র সফর আট থেকে দশ দিনের হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিউইয়র্কে অবস্থানের সময় জাতিসংঘের মূল কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সাইডলাইন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এসব অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, অভিবাসন এবং পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে তাঁর নির্দিষ্ট বৈঠক ও কর্মসূচির তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে একজন বাংলাদেশির উপস্থিতি দেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি দীর্ঘ বিরতিও জড়িয়ে আছে। এর আগে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর আবারও তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফর হতে যাচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের পরিধিও বেড়েছে। ফলে এবারের সফরকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। গত ২১ থেকে ২৬ জুন ওই সফরে তিনি দুই দেশ সফর করেন। সফরকালে জনশক্তি রপ্তানি, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, করিডর স্থাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি সই হয়। এর পর বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেলেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে আপাতত অন্য কোনো দেশে সফর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর সফরটি আবেগ ও আগ্রহের একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় পর দেশের সরকারপ্রধানকে নিজেদের বসবাসের দেশে স্বাগত জানানোর সুযোগকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রস্তুতি চলছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়েও তাঁর সফরকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি, সম্ভাব্য বৈঠক এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের মধ্যে রয়েছে। সরকারি ও কূটনৈতিক পর্যায়ের প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ সফরসূচি জানানো হতে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহে এ বিষয়ে আরও স্পষ্টতা আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নেবেন তারেক রহমান। অধিবেশনে তাঁর বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সফরটি শেষ হবে। দীর্ঘ দুই দশক পর তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফর তাই কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।