প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি শ্রমবাজার সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের স্বার্থ এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা নিজেদের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, হয়রানিমুক্ত জীবন এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে সাধারণ এজেন্সিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, দেশের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হলেও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিযোগিতামূলক ও উন্মুক্ত শ্রমবাজারের পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতেও সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পরিচালনার সময় সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় বিদেশ যেতে আগ্রহী শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছিল। এতে অনেক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
এবারও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর দাবি, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হলে একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যেতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সাধারণ শ্রমিকের জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে পরিবারকে জমি-জমা বিক্রি, ঋণ গ্রহণ কিংবা অন্যান্য সম্পদ বন্ধক রাখার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাংলাদেশের বহু পরিবারের জন্য আর্থিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও বিভিন্ন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। ফলে এই শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদেশগামী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে রিক্রুটিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং এর সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের সদস্যদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও বৈধ অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করা হলে শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার ব্যয় কমানো এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জামায়াতের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শুধু শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, ভিসা, কর্মপরিবেশ, বেতন, আবাসন এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশ যাওয়ার আগে শ্রমিকদের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ নেওয়া হচ্ছে এবং সেই অর্থের বিপরীতে কী ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে, তা নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা, তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং বিদেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য বিবৃতিতে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। অতীতে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে নির্দিষ্টসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। শ্রমিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান না পাওয়ার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব কারণে বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের যাচাই-বাছাই ও সরকারি তদারকি জোরদারের দাবি দীর্ঘদিনের।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মপ্রত্যাশীদের মধ্যে যেমন আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত খরচ ও প্রতারণার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য বিদেশে যাওয়ার খরচ একটি বড় বিষয়। প্রবাসে গিয়ে আয় করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ এবং সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশায় অনেকে জমি বা সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার অর্থ সংগ্রহ করেন। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হলে এর প্রভাব শুধু একজন শ্রমিকের ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর পড়তে পারে।
এ অবস্থায় শ্রমবাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, শ্রমিকদের কম খরচে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনোভাবেই তাঁদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
তবে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন এবং এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ব্যয় কত হবে—এসব বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই চূড়ান্ত তথ্যের ভিত্তি হবে। রাজনৈতিক দলের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, নির্ধারিত খরচ এবং নিয়োগব্যবস্থার শর্তগুলো প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগও অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও ব্যয়সাশ্রয়ী বিদেশগমন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে, অন্যদিকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শ্রমবাজার নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।