গঙ্গা ব্যারাজের নথি কেন এত গোপন?

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্প। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা ও বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে প্রকল্প অনুমোদনের পরও এর গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে যে গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে, তা বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে বিভিন্ন মতের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা আলোচনা করেন। সভায় বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি থাকলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান কর্মকর্তারা অংশ নেননি। প্রকল্প প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাই সভায় অংশ নেন।

তবে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে প্রকল্পের তথ্যভিত্তি নিয়ে। প্রকল্পটির সর্বশেষ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বা বিস্তারিত প্রকল্প নথি অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের কাছেই নেই। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান জানান, তাঁদের বিশ্লেষণ মূলত সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার নির্বাহী সারসংক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এমনকি উপস্থিত অনেক বিশেষজ্ঞও ওই সারসংক্ষেপ দেখেননি।

এ অবস্থায় প্রকল্পের সুফল, ঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার বড় অংশই অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ প্রকল্পটির আকার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় তথ্যভিত্তিক জাতীয় বিতর্ক অত্যন্ত প্রয়োজন।

চলতি বছরের ১৩ মে একনেকের সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর থেকেই প্রকল্পের নথিপত্র প্রকাশের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন, বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি তথ্য উন্মুক্ত করা হলে স্বাধীনভাবে প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। এতে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সুবিধা এবং ঝুঁকি নিয়ে আরও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

কিন্তু তিন মাস পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ‘চলমান’ প্রকল্প হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ থাকার কথা জানা গেছে। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং আগামী সাত বছরে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ প্রকল্পটি যখন বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও এর মূল নথি নিয়ে জনপরিসরে স্বচ্ছতা তৈরি হয়নি। এমনকি দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নদী বিশেষজ্ঞ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশের পরও নথিপত্র হাতে পাননি বলে জানা গেছে।

এখানেই গোপনীয়তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্পের নথি যদি জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কারিগরি উৎকর্ষ বিবেচনায় তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সামনে প্রকাশ করতে আপত্তি কোথায়—এ প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের ইতিহাসও দেখায়, এটি কেবল একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। ষাটের দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে দেশীয় প্রতিষ্ঠানও প্রকল্পটির বিভিন্ন সমীক্ষা করেছে।

২০০২ ও ২০১০ সালের সমীক্ষায় রাজবাড়ীর পাংশ ও পাবনার সুজানগরকে ব্যারাজের সম্ভাব্য দুই প্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় ভারতের কাছে প্রকল্পের সারসংক্ষেপ হস্তান্তর করা হয়। একসময় ভারতের সহযোগিতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও পরবর্তী সময়ে চীন ও জাপানের আগ্রহও সামনে আসে। নেদারল্যান্ডসের কারিগরি সহায়তায় প্রণীত বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যানেও প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ফলে গঙ্গা ব্যারাজ ঘিরে বিভিন্ন দেশের আগ্রহের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পের নথি গোপন রাখার পরিবর্তে উন্মুক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তথ্য প্রকাশ্যে থাকলে প্রকল্প নিয়ে বিদেশি বা দেশীয় কোনো পক্ষের একতরফা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে আসে।

একই সঙ্গে নথিপত্র প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবও স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। একটি বড় নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, ভূগর্ভস্থ পানি এবং নিম্ন অববাহিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। এসব তথ্য ছাড়া প্রকল্পের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রকল্পের পক্ষে থাকা সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠান সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এর কারিগরি ভিত্তি শক্তিশালী। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে নথিপত্র প্রকাশের মাধ্যমে সেই সক্ষমতা জনসমক্ষে তুলে ধরাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। এতে সমালোচকদের প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়া সম্ভব হবে।

গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হতে পারে। কিন্তু এর গুরুত্ব যত বেশি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বেশি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রকল্প কোনো ধরনের তথ্যের ঘাটতি রেখে এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

প্রকল্পের নথি প্রকাশ মানেই জাতীয় নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক স্বার্থ উপেক্ষা করা নয়। বরং সংবেদনশীল বিষয়গুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষিত রেখে কারিগরি ও অর্থনৈতিক তথ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে। এতে তথ্যনির্ভর বিতর্ক তৈরি হবে এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠনের সুযোগ বাড়বে।

গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে প্রশ্ন তাই প্রকল্পটি হবে কি হবে না—শুধু এতটুকু নয়। বড় প্রশ্ন হলো, যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, তার ভিত্তি সম্পর্কে দেশের মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা কতটা জানবেন। প্রকল্পটি যদি সত্যিই দেশের স্বার্থে সুচারুভাবে পরিকল্পিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিকল্পনার নথি গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা সরকারের দায়িত্ব।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত