দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বাড়ছে আইনি জটিলতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বাড়ছে আইনি জটিলতা

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের পর দেশের নীতিনির্ধারণী পদ, জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না—এ প্রশ্নকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংবিধান, নাগরিকত্ব আইন, নির্বাচনসংক্রান্ত বিধান এবং সরকারি পদে নিয়োগের যোগ্যতার মধ্যে বিদ্যমান কিছু অস্পষ্টতা এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে আইনজীবী ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশে বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেকেই একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকত্বও ধরে রেখেছেন। বৈশ্বিক বাস্তবতায় দ্বৈত নাগরিকত্ব এখন অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তবে একজন ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক দায়িত্বে আসেন, তখন তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থান, আনুগত্য এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন। এই বিধানকে কেন্দ্র করেই দ্বৈত নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে মূল বিতর্কের সূত্রপাত।

তবে নাগরিকত্বের অন্যান্য বিধান এবং পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তনের কারণে বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বহাল থাকা এবং বিদেশি নাগরিকত্ব ধারণ করার বিষয়টি কীভাবে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নটি শুধু নির্বাচনী আইনেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য কি না, মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সাংবিধানিক বাধা আছে কি না এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর কোনো আইনগত বা আনুগত্যগত দায়বদ্ধতা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের পর্যায়ে থেকেছে।

সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্বের প্রশ্নও অতীতে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজের অথবা পরিবারের সদস্যদের বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে এলে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।

বিচার বিভাগেও বিভিন্ন সময়ে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোনো বিচারপতির বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি সামনে এলে বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান কতটা গ্রহণযোগ্য—এ প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এসব বিষয়ে পৃথক ঘটনা, আইন ও সাংবিধানিক বিধানের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, তবু সামগ্রিকভাবে বিষয়টি দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনগত কাঠামোর দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। কারণ একজন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, নাকি কেবল নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এই দুই অবস্থার মধ্যে আইনগত পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জমা দেওয়ার প্রমাণপত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আবার অন্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমোদন বা সনদ পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

এ ধরনের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসার অভিযোগও রয়েছে। এতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও অন্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই ধরনের নথি গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় প্রশ্ন ওঠে—দ্বৈত নাগরিকত্বের বিধান বাস্তবায়নে দেশে অভিন্ন কোনো মানদণ্ড আছে কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। কারণ মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা কোন নথিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করবেন, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া কখন সম্পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং কোনো প্রার্থী বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বহাল রাখলেও বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে অযোগ্য হবেন কি না—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না থাকলে নির্বাচনকালীন বিতর্ক সহজেই আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় পুরোনো বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা অন্য কোনো নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তির বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে তাঁর দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি কী—এ বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা এবং মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা সব ক্ষেত্রে একই বিধানের অধীনে নির্ধারিত হয় না। ফলে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে যে বিধান প্রযোজ্য, তা সরাসরি একজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত বিধান আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য। বিদেশে বসবাসের কারণে কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর বাংলাদেশের সঙ্গে সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্বও বহন করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাঁর কোনো আইনগত দায়িত্ব বা আনুগত্যের প্রশ্ন থাকলে তা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

সুশাসন ও আইনের শাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে নাগরিকদের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমতে পারে। একই পরিস্থিতিতে এক প্রার্থীর ক্ষেত্রে একটি নীতি এবং অন্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি প্রয়োগের সুযোগ থাকলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়বে। তাই দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার ভিত্তিতে নয়, বরং স্পষ্ট আইন ও অভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগও বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি আরও বেশি সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার ও দেশের সাংবিধানিক স্বার্থ—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি সুসংহত নীতিমালা প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কোন পদে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, কোন পদে পারবেন না, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া কখন সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হবে এবং নির্বাচনের সময় কোন ধরনের নথি গ্রহণযোগ্য হবে—এসব বিষয় আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি পদে নিয়োগের সময় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্যও একটি নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।

সবশেষে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের সঙ্গে বিদেশি নাগরিকত্ব একই সঙ্গে বহনকারী একজন ব্যক্তির রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সীমা কোথায়। এই প্রশ্নের উত্তর যদি আইন ও সংবিধানে পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত না থাকে, তাহলে প্রতিটি নির্বাচন, নিয়োগ কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সুস্পষ্ট, বৈষম্যহীন ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত