প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আউশ মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়ায় লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এর সঙ্গে আউশ মৌসুমে সরকারি উদ্যোগে ধান সংগ্রহ না হওয়া এবং বাজারে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
বর্তমানে মাধবপুরের বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ আউশ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, সার, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। অথচ উৎপাদিত ধানের বাজারমূল্য সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে ভালো ফলন পেয়েও কৃষকের মুখে হাসি নেই।
তেলিয়াপাড়ার কৃষক মো. আমজাদ বলেন, ফলন ভালো হলেও এতে কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না। ধান উৎপাদনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, বাজারে বিক্রি করে তা তুলে আনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সার-কীটনাশক ও কৃষিশ্রমিকের মজুরির পাশাপাশি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচও বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি।
মাধবপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ৬ হাজার ৮১২ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মাঠে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ মৌসুমে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪ দশমিক ৭ টন পর্যন্ত ফলন হতে পারে।
ধর্মঘর এলাকার কৃষক আমির আলী বলেন, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে ধান চাষে কৃষককে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। এক বিঘা জমির ধান কাটতে হারভেস্টার মেশিনে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এরপর মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের খরচও যুক্ত হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান ঘরে ওঠার পরপরই বাজারে মৌসুমি ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচের চাপ এবং নগদ অর্থের প্রয়োজন থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে হয় বলে ধান ধরে রাখার মতো আর্থিক সক্ষমতাও অনেকের নেই। এই সুযোগে ফড়িয়ারা তুলনামূলক কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন।
কৃষক শহীদ মিয়ার মতে, কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহিত করতে শুধু প্রণোদনা, সার-বীজ বা কৃষি পরামর্শ যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। তাঁর প্রশ্ন, আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে ধান কেনা না হলে বাজারে দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকছে, তাহলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা হবে না কেন?
আরেক কৃষক কায়সার বলেন, কয়েক বছর আগে ধানের দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ধান চাষ থেকে সরে গিয়েছিলেন। একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে কৃষকদের মধ্যে ধান চাষের আগ্রহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
তিনি বলেন, কৃষককে উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও উৎপাদন শেষে ধান বিক্রি করে কৃষকের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা থাকে, সেই হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। উৎপাদন খরচ, শ্রম এবং পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করেই ধানের দাম নির্ধারণ করা উচিত।
মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার জানান, কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এ বছর বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তা ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আউশের ফলন ভালো হয়েছে। তবে ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। কৃষকেরা যাতে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা রেজাউর ইসলাম বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে ধান কেনা হয় না। বাজারে ধানের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে খাদ্য বিভাগের সরাসরি তেমন কোনো ভূমিকা নেই।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, চলতি আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে বড় আকারে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভর্তুকিতে হারভেস্টার মেশিনও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকেরা যাতে উৎপাদিত ধানের ভালো দাম পান, সে বিষয়েও মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
তবে কৃষকদের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন নয়, উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। ভালো ফলন কৃষির জন্য ইতিবাচক হলেও বাজারে সেই ফলনের অর্থনৈতিক সুফল কৃষকের হাতে না পৌঁছালে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আউশের বাজারে সরকারি নজরদারি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর কার্যকর উদ্যোগ এখন কৃষকদের প্রধান প্রত্যাশা।