প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শেয়ারবাজারে টানা পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। আগের সাত কর্মদিবসের মধ্যে ছয় দিন সূচক কমার পর বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে নতুন সপ্তাহের লেনদেন শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৮৪ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে। এতে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৬৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৭২২ পয়েন্টে নেমেছে। এ নিয়ে টানা আট কর্মদিবসে সূচকটি হারাল ১৮১ পয়েন্ট।
গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স লেনদেনের পুরো সময়ে আগের দিনের তুলনায় কমবেশি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে গতকালসহ তার আগের সাত কর্মদিবসের অধিকাংশ দিনেই লেনদেনের শুরুতে সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত পতনেই লেনদেন শেষ হয়েছে।
রোববার সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর পর প্রথম ১০ মিনিটে ডিএসইএক্স ২৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮১৪ পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়। এরপরই বাজারে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে এবং সূচক নিম্নমুখী হতে শুরু করে। লেনদেন শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচকটি ৯৮ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৭১৫ পয়েন্টে নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বড় পতন এড়ানো যায়নি।
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অনুকূল কিছু পরিস্থিতি তৈরি হলেও তার প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না। একদিকে ব্যাপক শিথিলতাসহ মার্জিন ঋণ বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। অন্যদিকে ধীরে ধীরে কমছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার। সাধারণত এসব কারণে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ দেশের চলমান গ্যাস সংকট। কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিতে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারও দ্রুত এ সংকট সমাধানের বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার তালিকাভুক্ত ফু-ওয়াং ফুড কোম্পানি গ্যাস সংকটের কারণে ‘লে-অফ’ ঘোষণা করেছে। কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হওয়ার মতো ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব আগের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জও বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে সক্রিয় হয়েছে। বাজার সূত্রের ভাষ্য, এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে সক্রিয় জুয়াড়ি চক্র এবং কারসাজিকে উৎসাহিত করে এমন পক্ষগুলোর লেনদেন কমেছে। এতে শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদা কমে গিয়ে বাজারে সামগ্রিক বিক্রির চাপ বেড়েছে।
রোববার দিনের শুরুতে দুই শতাধিক কোম্পানির শেয়ারদর বাড়লেও শেষ পর্যন্ত চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। দিন শেষে ২৯৯টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ২৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২২টির দর।
খাতভিত্তিক লেনদেনেও ছিল ব্যাপক নেতিবাচক প্রবণতা। এমন কোনো খাত ছিল না, যেখানে অধিকাংশ শেয়ারের দর পতন হয়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের গড় দর কমেছে প্রায় আড়াই শতাংশ। বীমা খাতের গড় দরপতন হয়েছে ২ শতাংশের বেশি। বাজার মূলধনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় ব্যাংক খাতের গড় দর কমেছে ১ শতাংশের বেশি।
তবে দরপতনের মধ্যেও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। রোববার ডিএসইতে মোট ৭১১ কোটি টাকার বেশি শেয়ার ও ইউনিট কেনাবেচা হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৯ কোটি টাকা বেশি।
বিনিয়োগকারীদের ধরন বিশ্লেষণেও বিক্রির চাপের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। মোট ৭১১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। বিপরীতে একই পরিমাণ টাকার শেয়ার ক্রয়ে তাদের অংশ ছিল ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এদিন বিক্রির তুলনায় বেশি শেয়ার কিনেছেন। তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ছিল উল্টো প্রবণতা—তারা কেনার তুলনায় বেশি শেয়ার বিক্রি করেছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান পতন শুধু সুদহার বা মার্জিন ঋণের মতো বাজারভিত্তিক সূচকের ফল নয়। গ্যাস সংকট, শিল্প উৎপাদনে অনিশ্চয়তা, কোম্পানির আয় নিয়ে উদ্বেগ এবং বাজারে কারসাজি কমানোর কারণে কৃত্রিম চাহিদা হ্রাস—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। ফলে মৌলভিত্তিক বিনিয়োগের পাশাপাশি বাজারে সামগ্রিক আস্থাও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।