কেন যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
কেন যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ছয় বছর আগে রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল। তখন তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিল অনেকটাই স্পষ্ট—ব্রিটিশ রাজপরিবারের দায়িত্ব, তীব্র গণমাধ্যমের নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রেই নতুন জীবন গড়ে তুলবেন তাঁরা। এমনকি মাত্র ১৫ মাস আগেও হ্যারি বলেছিলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি তিনি কল্পনা করতে পারছেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান বদলেছে। এবার দুই সন্তান আর্চি ও লিলিবেটকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসের পরিকল্পনা করেছেন এই দম্পতি। আগস্টের শেষ দিকেই তাঁদের ব্রিটেনে যাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরে সন্তানদের স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

হ্যারির এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—যে দেশে ফিরতে তিনি এতটা অনিচ্ছুক ছিলেন, সেখানে এখন কেন পরিবার নিয়ে ফিরছেন? এর সরাসরি কোনো একক উত্তর নেই। বরং পারিবারিক সম্পর্ক, সন্তানদের শিক্ষা, নিজের শিকড়ের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় এবং রাজপরিবারের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্তটি এসেছে বলে মনে করছেন রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকেরা।

হ্যারি ও মেগান যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তাঁদের দুই সন্তান সেখানেই বড় হয়েছে। আর্চির জন্ম যুক্তরাজ্যে হলেও ছোট বোন লিলিবেটের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। এবার তাঁদের ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুই সন্তানকে যুক্তরাজ্যের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে এবং সেপ্টেম্বর থেকে তাদের সেখানে পড়াশোনা শুরু করার কথা। পরিবারটি লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত, রাজপরিবারের মালিকানাধীন নয় এমন বাসভবনে থাকার পরিকল্পনা করছে।

সন্তানদের নিজেদের বাবার দেশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানোই সম্ভবত এই সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় কারণ। হ্যারি দীর্ঘদিন ধরে নিজের শৈশব ও ব্রিটেনের সঙ্গে তাঁর আবেগের কথা বলেছেন। তাঁর কাছে যুক্তরাজ্য শুধু একটি দেশ নয়, বরং তাঁর সন্তানদের পারিবারিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে আর্চি ও লিলিবেট যেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশে বেড়ে না ওঠে, বরং তাদের বাবার দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচিত হয়—এই আকাঙ্ক্ষা সিদ্ধান্তটিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সন্তানদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে হ্যারি ও মেগান আবার রাজপরিবারের কর্মরত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। তাঁদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তাঁরা ব্যক্তিগত নাগরিক হিসেবেই থাকবেন এবং রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ফেরার পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত নেই। তাঁদের নতুন আবাসও কোনো রাজকীয় বাসভবন হবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে হ্যারির সঙ্গে তাঁর বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সম্পর্ক। গত কয়েক বছরে বাবা ও ছেলের সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হ্যারি তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, স্মৃতিকথা এবং প্রামাণ্যচিত্রে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় প্রকাশ্যে এনেছেন। এসব ঘটনায় পরিবারের অনেক সদস্য ক্ষুব্ধ হন। বিশেষ করে তাঁর ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

তবে চার্লসের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উষ্ণতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত মাসে হ্যারি, মেগান ও তাঁদের সন্তানরা যুক্তরাজ্যে গেলে হাইগ্রোভে রাজা চার্লসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন। এই সাক্ষাৎকে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ রাজা চার্লসের জন্যও আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে চার্লসের স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি এই পারিবারিক সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৪ সালে তাঁর ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। চিকিৎসায় তিনি সাড়া দিচ্ছেন বলে জানানো হলেও, হ্যারি নিজেই অতীতে বাবার সঙ্গে আরও সময় কাটানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ফলে যুক্তরাজ্যে ফিরে থাকলে বাবার সঙ্গে নিয়মিত দেখা করার সুযোগ তৈরি হবে—এটিও তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে একটি মানবিক কারণ হতে পারে।

তবে বাবা ও ছেলের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও ভাই উইলিয়ামের সঙ্গে হ্যারির দূরত্ব এখনো বড় বাধা। রাজপরিবারের বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে, হ্যারি ও মেগানের ফিরে আসা উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক করে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং দুই ভাইয়ের মধ্যে বহু বছরের অবিশ্বাস ও ক্ষোভের কারণে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে থাকতে পারে।

হ্যারির যুক্তরাজ্যে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ছিল নিরাপত্তা। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আর থাকেনি। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হ্যারি আইনি লড়াইও করেছেন, কিন্তু ২০২৫ সালে সেই চ্যালেঞ্জে হেরে যান। এরপর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ওই পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনার কথা তিনি ভাবতে পারছেন না।

এবার সেই অবস্থানও বাস্তবে বদলে গেছে। যদিও তাঁদের নিরাপত্তাব্যবস্থা কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, রাজপরিবার ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নির্ধারণ করা হয় ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে এবং এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ নিরাপত্তা নিয়ে আগের উদ্বেগ পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। বরং পরিবারটি এখন যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিও তাদের নিরাপত্তার ধরন ও পরিমাণ নিয়ে সরকারি কোনো বিস্তারিত ঘোষণা নেই। এ অবস্থায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সরকারি নিরাপত্তার মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় হবে, তা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গণমাধ্যমের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। হ্যারি বহু বছর ধরে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরব। তাঁর অভিযোগ ছিল, সংবাদমাধ্যম তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি চালিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রকাশকদের বিরুদ্ধে তাঁর আইনি লড়াইও হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু মামলায় তিনি জয় পেয়েছেন, আবার কিছু মামলায় তাঁর দাবি আদালতে খারিজও হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলে এই গণমাধ্যমের আগ্রহ আরও বাড়বে—এটা প্রায় নিশ্চিত। কারণ হ্যারি-মেগান এখন আর শুধু রাজপরিবারের সদস্য নন; তাঁরা নিজেরাই বিশ্বজুড়ে আলোচিত দুই জন ব্যক্তিত্ব। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের জীবন, নেটফ্লিক্সের বিভিন্ন প্রকল্প, মেগানের ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং হ্যারির দাতব্য কর্মকাণ্ড—সবকিছুই নিয়মিত জনআলোচনার বিষয়। তাই ব্রিটেনে বসবাস করলেও তাঁরা পুরোপুরি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে পারবেন না।

তবু এই প্রত্যাবর্তনকে শুধু রাজপরিবারে ফিরে আসা হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হ্যারি ও মেগান আনুষ্ঠানিকভাবে রাজপরিবারে ফিরছেন না; বরং তাঁরা তাঁদের সন্তানদের জন্য যুক্তরাজ্যে একটি নতুন পারিবারিক অধ্যায় শুরু করতে চাইছেন। একই সঙ্গে হ্যারির জন্য এটি তাঁর শৈশব, পরিবার এবং বাবার সঙ্গে সম্পর্কের কাছে আবার কিছুটা ফিরে যাওয়ার সুযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটিও বলা যাচ্ছে না। তাঁদের ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়ি থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কও বজায় থাকবে। ফলে এটি স্থায়ীভাবে আমেরিকা ছেড়ে ব্রিটেনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত, নাকি দুই দেশের মধ্যে জীবন ভাগ করে নেওয়ার নতুন ব্যবস্থা—তা সময়ই স্পষ্ট করবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত হ্যারির মানসিক অবস্থানে। কয়েক বছর আগে নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যম ও পারিবারিক বিরোধ তাঁকে যুক্তরাজ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় সেই দূরত্ব কমানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজপরিবারের সঙ্গে সব বিরোধ মিটে গেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিশেষ করে উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো কঠিন। কিন্তু হ্যারির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে যে, একসময় যে দরজাটি তিনি প্রায় বন্ধ বলে মনে করেছিলেন, সেটি এখন আবার তাঁর পরিবারের জন্য খোলার মতো একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একজন রাজপুত্রের দেশে ফেরার গল্প নয়। এটি এক বাবা, এক ছেলে এবং এক পরিবারের বহু বছরের দূরত্ব পেরিয়ে নতুন করে সম্পর্ক খোঁজার গল্পও হতে পারে। সামনে সেই সম্পর্ক কতটা মেরামত হবে, হ্যারি-মেগান ব্রিটিশ জনজীবনে কীভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবেন এবং তাঁদের সন্তানরা কীভাবে বাবার জন্মভূমির সঙ্গে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলবে—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত