রাজবাড়ীতে লাম্পি স্কিনে বিপাকে গরুপালনকারীরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ বার
রাজবাড়ীতে লাম্পি স্কিনে বিপাকে গরুপালনকারীরা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজবাড়ী জেলায় গরুর মধ্যে লাম্পি স্কিন রোগের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত গরু এই ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশুর মৃত্যুতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারি ও প্রান্তিক গরুপালনকারীরা। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো গরু পালন করে যখন সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন রোগের প্রাদুর্ভাব তাদের সেই আশাকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

জেলার প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৬ হাজার ১২১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত গাভির খামার ৩৬৬টি এবং অনিবন্ধিত গাভির খামার ৮ হাজার ৬০৯টি। নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৩৪টি এবং অনিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ৭ হাজার ১৪৩টি। সব মিলিয়ে জেলায় গরুর সংখ্যা ১ লাখ ২১ হাজার ৯২টি।

বিপুলসংখ্যক গরুর বিপরীতে লাম্পি স্কিন রোগ প্রতিরোধে টিকার সরবরাহ নিয়ে রয়েছে বড় ঘাটতি। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছরে রাজবাড়ীতে সরকারিভাবে এলএসডি বা লাম্পি স্কিন ডিজিজের মাত্র ৬ হাজার ৫০০ ডোজ টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ জেলার চাহিদা প্রায় দেড় লাখ ডোজ। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি টিকার সরবরাহ অত্যন্ত কম হওয়ায় সব গরুকে টিকার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রোগের বিস্তার ঠেকাতে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, লাম্পি স্কিন ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় আক্রান্ত গরুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। তবে সুস্থ গরুকে সময়মতো টিকা দেওয়ার মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা এবং মশা, মাছি ও আঁঠালির মতো বাহক নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালের দিকে লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। শুরুর দিকে বড় খামারগুলোতে আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। পরবর্তীতে টিকাদান ও সচেতনতামূলক উদ্যোগের ফলে বিভিন্ন এলাকায় রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক পরিবার বাড়িতে অল্পসংখ্যক গরু পালন করলেও তারা সবসময় রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও টিকাদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন।

টিকা ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে আরেক ধরনের বাস্তবতা। সরকারি ব্যবস্থায় একটি অ্যাম্পুলে পাঁচটি গরুকে টিকা দেওয়া যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টিকার ক্ষেত্রে একটি অ্যাম্পুলে ১০টি গরুকে টিকা দিতে হয়। বেসরকারি পর্যায়ে এক অ্যাম্পুল টিকার দাম প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। স্বল্প আয়ের গরুপালনকারীদের জন্য এই ব্যয় অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকা দিতে আগ্রহী হন না।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদসী ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের বিধবা আসমা খাতুনের গল্প এই সংকটের মানবিক দিকটি স্পষ্ট করে। সংসারে কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় তিনি গরু পালন শুরু করেছিলেন। একটি গাভি, একটি ষাঁড় ও একটি বাছুর নিয়ে ধীরে ধীরে তাঁর স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়। গরু পালন থেকে আয় করে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা সঞ্চয়ের আশাও ছিল তাঁর।

কিন্তু সেই স্বপ্নে আঘাত হানে লাম্পি স্কিন। তাঁর বাছুরটি এই রোগে আক্রান্ত হলে তিনি রাজবাড়ী উপজেলা পশু হাসপাতালে চিকিৎসা করান। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাছুরটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। একটি বাছুরের মৃত্যুতে আসমা খাতুনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। তাঁর মতো প্রান্তিক গরুপালনকারীর জন্য এই ক্ষতি শুধু একটি পশু হারানোর ঘটনা নয়; এটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তায় বড় ধাক্কা।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, লাম্পি স্কিনের লক্ষণ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। পাংশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গরুর শরীরে ছোট গুটি আকারে দেখা দেওয়া এক ধরনের লক্ষণ এবং বড় গুটি হয়ে পরে ঘায়ের মতো হওয়ার আরেক ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে, খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যেতে পারে।

রোগের প্রভাবে গরুর উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া খামারিদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা। একটি দুধেল গাভি অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু চিকিৎসার খরচই বাড়ে না, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দৈনিক আয়ও কমে যায়। গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে যুক্ত খামারিদের ক্ষেত্রেও অসুস্থতার কারণে পশুর ওজন বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেত্রে খাদ্য ও পরিচর্যার ব্যয় চলতে থাকলেও প্রত্যাশিত আয় না আসায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলা লাইভস্টক অফিসার খায়ের উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে সদর উপজেলায় লাম্পি স্কিন রোগে ২০টি গরু মারা গেছে। তাঁর মতে, এ মৃত্যুহার স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। তিনি আরও জানান, বড় গরুর তুলনায় বাছুরদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে বাছুর পালনকারী পরিবারগুলোকে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর বিস্তার রয়েছে। সাধারণত মশা, মাছি ও আঁঠালির মতো বাহকের মাধ্যমে রোগটি ছড়াতে পারে। বর্ষার শুরুতে এ রোগের প্রকোপ বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। আক্রান্ত গরুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকলেও সুস্থ গরুকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে রোগটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে খামার পরিদর্শন এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভাইরাসজনিত এই রোগের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

রোগ প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে গরুপালনকারীদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গরুর শরীরে অস্বাভাবিক গুটি, জ্বর, খাবার কম খাওয়া বা দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। আক্রান্ত পশুকে অন্য গরু থেকে আলাদা রাখাও রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

রাজবাড়ীর মতো কৃষিনির্ভর জেলায় গরু পালন বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বড় খামারের পাশাপাশি গ্রামের অসংখ্য পরিবার এক বা দুইটি গরু পালন করে দুধ বিক্রি, বাছুর বিক্রি কিংবা ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। অনেক পরিবারের কাছে একটি গরুই তাদের সঞ্চয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ফলে রোগে একটি পশুর মৃত্যু কিংবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা তাদের পারিবারিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় টিকার সরবরাহ বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা এবং প্রান্তিক গরুপালনকারীদের সহজে প্রাণিচিকিৎসা সেবা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জেলার মোট গরুর সংখ্যা এবং টিকার চাহিদার সঙ্গে সরকারি সরবরাহের বড় ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রান্তিক গরুপালনকারীদের জন্য লাম্পি স্কিন এখন শুধু একটি পশুরোগ নয়, বরং জীবিকা ও পারিবারিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো টিকা, সচেতনতা এবং দ্রুত পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব। প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা এবং প্রয়োজনের তুলনায় টিকার ঘাটতি পূরণ করা গেলে রাজবাড়ীতে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি আসতে পারে। গরু হারিয়ে যে পরিবারগুলো আজ দিশাহারা, তাদের জন্য দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে স্বস্তির সবচেয়ে বড় আশ্বাস।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত