প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুন্দরবনের গহিন থেকে অবৈধভাবে কেটে আনা কাঠ পাচারের সময় বন বিভাগের অভিযানে একটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকায় মঙ্গলবার রাতে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ গরান কাঠবোঝাই নৌকাটি আটক করা হয়। তবে বনকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে নৌকায় থাকা কথিত কাঠ পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষা করার পাশাপাশি এই বিশাল বনভূমি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। ফলে সুন্দরবন থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে নেওয়া কিংবা অবৈধভাবে কাঠ পাচারের ঘটনা পরিবেশ ও বনজ সম্পদের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। এমন বাস্তবতায় সাতক্ষীরা রেঞ্জে বন বিভাগের সাম্প্রতিক অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে সাতক্ষীরা রেঞ্জের টেংরাখালী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির সদস্যরা শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন উপকূলবর্তী মইজদ্দির মোড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় বনকর্মীদের গতিবিধি টের পেয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা নৌকাটি ফেলে পালিয়ে যায়। পরে বনকর্মীরা সেখানে থাকা নৌকাটি তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ গরান কাঠ দেখতে পান।
টেংরাখালী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন জানান, অভিযানের সময় চোরাকারবারিদের ফেলে যাওয়া নৌকাটি দেখতে পেয়ে জব্দ করা হয়। নৌকাটিতে সুন্দরবনের গহিন এলাকা থেকে অবৈধভাবে কেটে আনা গরান কাঠ বোঝাই ছিল। পরে কাঠসহ নৌকাটি উদ্ধার করে টেংরাখালী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বনজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও একটি চক্র সুযোগ বুঝে বনের ভেতরে প্রবেশ করে গাছ কাটার চেষ্টা করে। পরে নৌপথ ব্যবহার করে এসব কাঠ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন।
গরান সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে সুন্দরবনের生态তন্ত্রে এই ধরনের গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বনের গাছপালা মাটি ধরে রাখা, উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক প্রতিরোধ তৈরি এবং নানা প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পুরো বনজ পরিবেশের ওপর পড়তে পারে।
বিশেষ করে সুন্দরবনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন বনজ সম্পদ রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই বন দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু বন্যপ্রাণী বা গাছপালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপকূলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
মঙ্গলবারের অভিযানে কাঠ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আটক করা সম্ভব না হলেও তাদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। জব্দ করা কাঠ ও নৌকার বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় বন আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু কাঠ জব্দ করলেই সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়। অবৈধভাবে বনের ভেতরে প্রবেশ, গাছ কাটা এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের আশপাশের বহু মানুষ জীবিকার বিভিন্ন প্রয়োজনে বন ও নদীনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
উপকূলের মানুষের জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কেউ মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া আহরণ করেন, কেউ মধু সংগ্রহ করেন। আবার কেউ নৌযান চালানো বা বনকেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈধ পেশার সঙ্গে যুক্ত। এই বাস্তবতায় বন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ পাচার করে যারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের উপকূলীয় এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবেও সংবেদনশীল। নদী, খাল ও ছোট-বড় জলপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকায় নৌযানের মাধ্যমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। এই সুযোগ ব্যবহার করে অবৈধভাবে কাঠ পরিবহনের চেষ্টা হতে পারে। ফলে বন বিভাগের টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি নৌপথে নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক অভিযানে বনকর্মীরা কাঠবোঝাই নৌকাটি সময়মতো শনাক্ত করতে পারায় পাচারের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সুন্দরবনের ভেতর ও আশপাশে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতের বেলায় নৌপথে চলাচলকারী সন্দেহজনক নৌযানের ওপর নজরদারি বাড়ানো গেলে অবৈধ কাঠ পরিবহনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
সুন্দরবন রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। বনকে শুধু সরকারি সম্পদ হিসেবে না দেখে স্থানীয় মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বন রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে বন বিভাগের কাজও আরও কার্যকর হতে পারে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে কাঠবোঝাই নৌকা জব্দের ঘটনাটি তাই শুধু একটি অভিযান বা একটি নৌকা আটকের ঘটনা নয়। এটি সুন্দরবনের বনজ সম্পদ রক্ষায় চলমান চ্যালেঞ্জেরও একটি প্রতিচ্ছবি। বন থেকে একটি একটি করে গাছ হারিয়ে গেলে তার প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন। তাই অবৈধ কাঠ কাটা ও পাচার বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বন বিভাগের জব্দ করা নৌকা ও কাঠ এখন আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। একই সঙ্গে অভিযানের সময় পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে এই অভিযান আরও কার্যকর ফল বয়ে আনবে। সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় এমন নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখাই এখন সময়ের দাবি।