প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় থেকেই তারা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা রাখার পক্ষে ছিলেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সীমিত পরিসরে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে খাগড়াছড়ির একটি কমিউনিটি সেন্টারে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন সারজিস আলম। তাঁর বক্তব্যে একদিকে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে, অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, চাকরি ও জীবনযাপনের বাস্তব প্রতিবন্ধকতার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সারজিস বলেন, তাঁদের আন্দোলন মূলত ছিল যৌক্তিক কোটা সংস্কারের আন্দোলন। সে সময় তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলার মানুষ এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতো নির্দিষ্ট কিছু স্টেকহোল্ডারের জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা রাখা যেতে পারে। তাঁর মতে, দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সুযোগ-সুবিধা এক নয়। বিশেষ করে সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য রয়েছে।
পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সমতলের মানুষ শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে চাকরি, বসবাস এবং পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান। অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য একই সুযোগ অর্জন অনেক বেশি কঠিন। ফলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে প্রতিযোগিতায় সমান জায়গায় আনতে তাদের জন্য যৌক্তিক মাত্রায় অগ্রাধিকার থাকা প্রয়োজন।
তবে কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও করেন সারজিস। তাঁর দাবি, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সুযোগ না পেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট কোটা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাপ্য ব্যক্তিকে সুযোগ না দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোটা রাখার পাশাপাশি এর অপব্যবহার বন্ধ করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
খাগড়াছড়িতে বক্তব্য দেওয়ার সময় দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিএনপির সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু এখন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পাওয়ার পর বিএনপি সেই একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু করেছে, যে ব্যবস্থার কারণে দলটি অতীতে নির্যাতিত হয়েছিল।
সারজিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পরও যদি আগের মতো দলীয়করণ, প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সারজিস। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির দামের সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।
তিনি অভিযোগ করেন, মানুষ অর্থ দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছে না এবং মূল্য পরিশোধ করেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। একই সময়ে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব পরিস্থিতিকে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তে থাকা চাপ হিসেবে তুলে ধরেন এনসিপির এই নেতা।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে সারজিস বলেন, দলটি এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ছয় মাসে সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ, এ সময়ে বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একইসঙ্গে চাঁদাবাজিকে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান হিসেবে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, কয়েক লাখ মানুষের পেশা এখন চাঁদাবাজি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাদের হয়রানি, অপমান এবং হত্যার হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের হেনস্তার অভিযোগ এবং সিলেটের জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে বদলির প্রসঙ্গও এ সময় তুলে ধরেন তিনি।
সারজিসের দাবি, সিলেটের ডিসি সারোয়ার আলম চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এক দিনের মধ্যেই তাঁকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। একইভাবে উপজেলা পর্যায়ে নারী ইউএনওদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এসব ঘটনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের মধ্য দিয়ে দেশের আগের রাজনৈতিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।
তবে বিএনপির ভালো কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি সমালোচনার জায়গায় সমালোচনা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন সারজিস। তিনি বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা সরকারের ভালো কাজকে ভালো বলবেন, কিন্তু জনগণের স্বার্থে ভুলের সমালোচনাও করবেন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ বা হুমকি তাদের পিছিয়ে দিতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সারজিস বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলেনি। যে মানুষ একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, সেই মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের জুলুম মেনে নেবে না। তিনি বিএনপিকে দ্রুত ‘হেদায়েতের পথে’ ফিরে এসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়েও বিএনপির বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ তোলেন সারজিস। তাঁর দাবি, বিএনপির নেতা বা দলীয় পদ-পদবি থাকলে জেলা পরিষদে থাকা যাবে—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের দলীয় বিবেচনা যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে পার্বত্য এলাকার সাধারণ মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হবে।
পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ গঠনেও বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দলীয়করণ বন্ধের আহ্বান জানান।
খাগড়াছড়ির সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে দেওয়া সারজিস আলমের বক্তব্যে তাই কোটা সংস্কারের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের অধিকার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়ও উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তাগুলোর একটি ছিল—পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোটা থাকতে পারে, তবে সেটি হতে হবে সীমিত, যৌক্তিক এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য নিশ্চিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে সুযোগের বৈষম্য কমানো এবং একই সঙ্গে কোটা ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সারজিস আলমের বক্তব্যে সেই ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাই নতুন করে সামনে এসেছে।