ইসলামাবাদে হাসপাতালে আগুন, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
ইসলামাবাদে হাসপাতালে আগুন, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৫ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিমস) হাসপাতালের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) ওয়ার্ডের নার্সারিতে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে থাকা ১৬ নবজাতকের মধ্যে মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় অবস্থিত নার্সারিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি এয়ার কন্ডিশনারের কম্প্রেসার বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া ও আগুনে ভরে যায় নার্সারির ভেতরের অংশ। সেখানে থাকা নবজাতকদের অনেকেই ইনকিউবেটর ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের সহায়তায় চিকিৎসাধীন ছিল।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি গাড়ি ও চারটি অ্যাম্বুলেন্স অংশ নেয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ করতে বেশ কিছু সময় ধরে কুলিং অপারেশন চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা ধোঁয়া ও অতিরিক্ত তাপের মধ্যেও নার্সারিতে প্রবেশ করে নবজাতকদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।

তবে আগুনের ভয়াবহতায় অধিকাংশ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে ১৪ নবজাতক সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৫। ফলে ঘটনার পর বিভিন্ন পর্যায়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সামান্য পার্থক্য দেখা দিয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে ১৫ নবজাতকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং অসহায় নবজাতকদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছিল, তাদের কাছে বুধবার সকালটি পরিণত হয়েছে এক অসহনীয় শোকের দিনে। সন্তানকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোকে শেষ পর্যন্ত সন্তানের মরদেহের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

ঘটনার পর হাসপাতালটির সংশ্লিষ্ট এমসিএইচ ওয়ার্ড সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, নার্সারিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নবজাতকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।

নিহত শিশুদের অভিভাবকদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, আগুন লাগার সময় ইনকিউবেশন সেন্টারে কোনো কর্মী উপস্থিত ছিলেন না। এমন অভিযোগের কারণে হাসপাতালের দায়িত্বশীলতা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারও দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।

ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল, জরুরি সময়ে হাসপাতালকর্মীদের ভূমিকা কী ছিল এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ঘটেছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

মর্মান্তিক এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিহত নবজাতকদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।

হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে নবজাতকদের জন্য নির্ধারিত নার্সারি বা ইনকিউবেশন ইউনিটে আগুনের ঘটনা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ জন্মের পরপরই চিকিৎসাধীন থাকা শিশুরা সাধারণত নিজেরা চলাফেরা করতে পারে না এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। ফলে আগুন, ধোঁয়া বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতক ও নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে অগ্নিনিরাপত্তার পাশাপাশি জরুরি উচ্ছেদ পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিয়মিত বৈদ্যুতিক পরিদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের মতো স্থানে ছোট একটি ত্রুটিও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে নার্সারি ও ইনকিউবেশন ইউনিটে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

ইসলামাবাদের এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে থাকা এতগুলো অসহায় নবজাতককে আগুনের হাত থেকে কেন রক্ষা করা গেল না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে পাকিস্তানের হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।

একটি দুর্ঘটনা কয়েকটি পরিবারের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। যে নার্সারিতে চিকিৎসার মাধ্যমে নতুন প্রাণগুলোকে পৃথিবীর আলোয় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছিল, সেখানেই আগুন কেড়ে নিল ১৫টি নিষ্পাপ প্রাণ। এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে নিহত শিশুদের পরিবার এবং পুরো পাকিস্তান। তাদের প্রত্যাশা, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে যেন একই ধরনের শোকের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত