লাখো মানুষের ঢলে চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক জশনে জুলুস

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৭ বার
লাখো মানুষের ঢলে চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক জশনে জুলুস

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস। বুধবার সকাল থেকে বন্দরনগরীর বিভিন্ন সড়কে ধর্মপ্রাণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতিতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসল্লিরা এতে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, এবারের জশনে জুলুসে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া থেকে জুলুসের কার্যক্রম শুরু হয়। এবারের জুলুসে নেতৃত্ব দেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব শাহ।

আয়োজকদের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, জুলুসটি নগরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে গিয়ে শেষ হয়। এর পথে মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাসসহ নগরের ব্যস্ত এলাকাগুলো অতিক্রম করে জুলুস। পরে মাদরাসা মাঠে মাহফিল, জোহরের নামাজ এবং দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এই ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশ নিতে বুধবার ভোর থেকেই চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ষোলশহর ও মুরাদপুরসহ আশপাশের এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জশনে জুলুসে যোগ দিতে চট্টগ্রামে আসেন। বিশেষ করে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

আয়োজকদের পরিচালিত বিভিন্ন মাদরাসা থেকেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও মুসল্লি এতে অংশ নেন বলে জানানো হয়েছে। কেউ বাস ও ট্রাকে করে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে নির্ধারিত স্থানে এসে জড়ো হন। নগরের সড়কগুলোতে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকের হাতে ছিল কালেমাখচিত পতাকা, আর মাথায় ছিল টুপি। হামদ, নাত, দরুদ ও ধর্মীয় স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জুলুসের পথ।

জশনে জুলুসকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে আগত মুসল্লিদের শরবত, পানি, খেজুর, কলা, রুটি ও জিলাপি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা মানুষের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ আয়োজনস্থলে মানবিক পরিবেশ তৈরি করে। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি একে অপরের প্রতি সহযোগিতা ও আতিথেয়তার দৃশ্যও দেখা যায়।

জুলুসকে ঘিরে ষোলশহর ও আশপাশের এলাকায় বসে অস্থায়ী মেলা। সেখানে আতর, টুপি, তসবিহ, পাঞ্জাবি, ইসলামি বইসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি খাবার, শরবত, চা, নাশতা, বিরিয়ানি, দেশীয় ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী নিয়ে দোকান বসে। পতাকা, মাথার ফিতা ও ব্যাজও বিক্রি হতে দেখা যায়। ফলে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় সাময়িকভাবে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এবারের জশনে জুলুসের মূল বার্তা হিসেবে শান্তি, মানবতা, অহিংসা ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে সামনে রাখা হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা মানুষের জন্য শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের পথ দেখায়। সেই আদর্শ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

জুলুস উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীকে আগে থেকেই সাজানো হয়। আয়োজনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও সবুজ পতাকা টানানো হয়। ষোলশহর, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, ওয়াসা, লালখান বাজার ও টাইগারপাস এলাকায় তৈরি করা হয় নানা আকৃতির তোরণ। এসব প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে জশনে জুলুসকে ঘিরে নগরে কয়েক দিন ধরেই ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়েছিল।

বিপুল মানুষের সমাগম বিবেচনায় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায়ও নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল জুলুসে অংশ নেওয়া মানুষের চলাচল ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা। মুসল্লিদের সুবিধার জন্য মাদরাসা ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশও জুলুসকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।

জশনে জুলুসে নেতৃত্বদানকারী আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি প্রকাশের একটি মাধ্যম। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেছেন এবং তাঁর শিক্ষা শান্তি, সম্প্রীতি, মানবতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়। বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে গিবত, হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।

আঞ্জুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ট্রাস্টের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ারও জশনে জুলুসের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ এবং ধর্মীয় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

চট্টগ্রামে জশনে জুলুস আয়োজনের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে আওলাদে রাসুল আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)-এর দিকনির্দেশনায় চট্টগ্রামে প্রথম জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে এ আয়োজন ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় জনসমাগমে পরিণত হয়েছে।

এবারের আয়োজনেও বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। ভোর থেকে দূর-দূরান্তের মানুষের চট্টগ্রামমুখী যাত্রা, নগরের সড়কে মানুষের দীর্ঘ সারি, ধর্মীয় সংগীত ও দরুদের ধ্বনি এবং স্বেচ্ছাসেবীদের নানা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে নগরীতে তৈরি হয় ব্যতিক্রমী পরিবেশ।

এদিকে এত বড় জনসমাগমে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, জশনে জুলুসের মতো বড় সমাবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের বড় দায়িত্ব। শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না বলেও তিনি জানান।

ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এবারের জশনে জুলুস চট্টগ্রামের জনজীবনে একটি উল্লেখযোগ্য দিনের আবহ তৈরি করেছে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ থেকে শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা গ্রহণের আহ্বানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যও অব্যাহত থাকল

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com