প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার শেরপুরে বৈধ চিকিৎসা সনদ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকার অভিযোগে এক কথিত চিকিৎসককে এক লাখ টাকা জরিমানা ও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) শেরপুর পৌরসভার স্যানালপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সুনীল কুমার বিশ্বাস নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করার পর তাঁর বিরুদ্ধে এ দণ্ড দেওয়া হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, সুনীল কুমার বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ ছাড়াই রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার পাশাপাশি নিষিদ্ধ ওষুধ প্রেসক্রাইব এবং শল্য চিকিৎসার মতো কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।
বৃহস্পতিবার স্যানালপাড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান হিমু। অভিযানের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চেম্বারে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ এবং ওষুধ পাওয়া যায়।
তল্লাশির সময় নিষিদ্ধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শল্য চিকিৎসার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে বলে অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যোগ্যতা ও বৈধ সনদ না থাকা সত্ত্বেও এসব কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সুনীল কুমার বিশ্বাসকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত সুনীল কুমার বিশ্বাস রামচন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে অভিযান পরিচালিত হওয়ায় এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা নেওয়া স্থানীয় রোগীদের একটি অংশের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অনুমোদন ছাড়া কেউ চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করলে রোগীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তি বা ছোট চেম্বারের ওপর নির্ভর করেন। কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা দেওয়ার দাবি করলে তাঁর প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ অনুমোদন সম্পর্কে অনেক সময় রোগী বা স্বজনেরা নিশ্চিত হতে পারেন না। ফলে অনুমোদনহীন চিকিৎসা কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা পেশা সরাসরি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। রোগ নির্ণয়, ওষুধ নির্ধারণ কিংবা অস্ত্রোপচারের মতো সিদ্ধান্তে সামান্য ভুলও গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকা অপরিহার্য।
শেরপুরের এই অভিযানে শল্য চিকিৎসার সরঞ্জাম পাওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ অস্ত্রোপচার বা এ ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নিরাপদ পরিবেশের পাশাপাশি নির্দিষ্ট চিকিৎসা অবকাঠামো দরকার। বৈধ অনুমোদন ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযানে প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আমিরুল ইসলাম। তাঁর উপস্থিতিতে অভিযানের সময় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযান পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেরপুর থানা পুলিশের সদস্যরা সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর সদস্যরাও অভিযানে অংশ নেন। প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উপস্থিতিতে অভিযানটি পরিচালিত হয়।
প্রশাসনের এমন অভিযানকে স্থানীয় পর্যায়ে অননুমোদিত চিকিৎসা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একটি অভিযান বা কয়েকজনকে জরিমানা করার মধ্য দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিতভাবে চিকিৎসাকেন্দ্র, ওষুধের দোকান এবং ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও চিকিৎসাসেবা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নিবন্ধন ও যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা দেওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি মানুষের কাছে ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু সামাজিক পরিচিতি বা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বৈধ চিকিৎসা যোগ্যতার বিকল্প নয়। একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখা, ব্যবস্থাপত্র দেওয়া কিংবা অস্ত্রোপচার করার জন্য আইনগত ও পেশাগত শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সঠিক সংরক্ষণ ও নির্ধারিত মেয়াদের বাইরে ওষুধ ব্যবহার করলে চিকিৎসার পরিবর্তে রোগীর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রশাসনের অভিযান স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। চিকিৎসা নিতে গিয়ে শুধু কম খরচ বা দ্রুত সেবা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা না করে চিকিৎসকের যোগ্যতা ও বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা দিচ্ছেন বলে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রশাসনকে জানানো যেতে পারে।
শেরপুর উপজেলা প্রশাসনের এই অভিযান তাই শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও জড়িত। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে বৈধ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অননুমোদিত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবারের অভিযানে সুনীল কুমার বিশ্বাসকে দেওয়া এক লাখ টাকা জরিমানা ও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে অননুমোদিত চিকিৎসা কার্যক্রম কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত চিকিৎসাসেবায় দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। শেরপুরের এই ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি নিজের জীবন ও সুস্থতার বিষয়ে আস্থা রাখেন। সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা চিকিৎসাব্যবস্থার প্রত্যেক অংশীজনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো আইন মেনে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।