ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মতপার্থক্য মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। একই পরিবারে বসবাসকারী মানুষ, একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সহকর্মী কিংবা একই আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের মধ্যেও চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্থক্য থাকতে পারে। সমাজে মতের বৈচিত্র্য থাকা অস্বাভাবিক নয়; বরং মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ভিন্নতার কারণেই এই পার্থক্য তৈরি হয়।

কিন্তু মতপার্থক্য যখন অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সামান্য কোনো মতভিন্নতা থেকেই অনেক সময় শুরু হয় কটূক্তি, অপমান, গালাগাল কিংবা সম্পর্কচ্ছেদের মতো ঘটনা। বিশেষ করে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে মতের অমিল হলে মানুষ অনেক সময় যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিকে আক্রমণ করতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক মতভিন্নতাকে অস্বীকার করেনি। বরং মতপার্থক্য ও মতবিনিময়ের ক্ষেত্রে ন্যায়, সংযম, প্রজ্ঞা এবং উত্তম আচরণের শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। তিনি সত্যের ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ় ও আপসহীন, কিন্তু সত্যের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেন প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সুন্দর ভাষা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়।’ সুরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতের এই নির্দেশনা মতভিন্নতার ক্ষেত্রে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে। অর্থাৎ সত্যের পক্ষে যুক্তি ও দলিল উপস্থাপন করা যাবে, নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা যাবে; কিন্তু সে কারণে অশালীনতা, অপমান কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোমলতা মানে নীতির প্রশ্নে দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়। মহানবী (সা.) সত্যকে সত্য এবং ভুলকে ভুল হিসেবে স্পষ্ট করেছেন। তবে কোনো ব্যক্তির ভুলের সমালোচনা করতে গিয়ে তার মর্যাদা নষ্ট করা, তাকে অপমান করা কিংবা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠাকে তিনি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁর আচরণে দৃঢ়তা ও সৌজন্যের একটি ভারসাম্য ছিল।

পবিত্র কোরআন ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। সুরা মায়েদার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। বরং ন্যায়বিচার করতে বলা হয়েছে, কারণ সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।

এই নির্দেশনার ব্যাপ্তি অনেক গভীর। কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিরোধ তৈরি হতে পারে। কিন্তু মতবিরোধের কারণে তার ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা বা তার প্রতি অন্যায় করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মহানবী (সা.)-এর জীবনে অমুসলিমদের সঙ্গেও সামাজিক ও মানবিক আচরণের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছে, প্রশ্ন করেছে, আপত্তি জানিয়েছে এবং কখনো কঠোর ভাষায়ও কথা বলেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি তাদের সঙ্গে যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে কথা বলেছেন। আহলে কিতাবের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও কোরআন উত্তম পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।

এমনকি ফেরাউনের মতো অত্যাচারী শাসকের কাছেও হজরত মুসা (আ.) ও হজরত হারুন (আ.)-কে কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সুরা ত্বহার ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’

এই আয়াত মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে ইসলামের ভাষাগত ও নৈতিক শিষ্টাচারকে সামনে আনে। যদি ফেরাউনের মতো জালিম ব্যক্তির সঙ্গেও দাওয়াতের সময় কোমল ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ থাকে, তাহলে সাধারণ মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের ভাষা কতটা সংযত হওয়া উচিত, তা সহজেই বোঝা যায়।

মহানবী (সা.) কঠোর স্বভাবের মানুষের সঙ্গেও শালীনতা বজায় রাখতেন। সহিহ বুখারিতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি তার কঠোর স্বভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেন। কিন্তু লোকটি প্রবেশ করার পর নবীজি (সা.) তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলেন। পরে আয়েশা (রা.) বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছে যার অশালীন আচরণ থেকে বাঁচতে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষের নেতিবাচক আচরণকে নিজের আচরণের মানদণ্ড বানানো জরুরি নয়।

অন্যের সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তাকে অপমান না করা এবং নিজের চরিত্রের সৌন্দর্য ধরে রাখা—নববী আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে কোমলতা ও ধীরতার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। অর্থাৎ উত্তেজনার মুহূর্তেও সংযম হারিয়ে না ফেলা ইসলামী চরিত্রের অংশ।

বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। একজন মানুষ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের মতামত হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। একইভাবে একটি মন্তব্যও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

অনলাইনে মতের অমিল হলেই অনেক সময় ব্যক্তিকে নিয়ে কটূক্তি শুরু হয়। কেউ একটি মত প্রকাশ করলে তার বক্তব্যের যুক্তি বিশ্লেষণের পরিবর্তে তার ব্যক্তিগত পরিচয়, পরিবার বা চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করা হয়। কেউ কঠিন ভাষায় কথা বললে তার জবাবে আরও কঠিন ভাষা ব্যবহার করা হয়। এভাবে মতের পার্থক্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়।

কোরআন এই ধরনের আচরণ থেকেও সতর্ক করেছে। সুরা হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডাকা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। পরের আয়াতে অযথা ধারণা, গোপন অনুসন্ধান ও গিবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়; বর্তমান ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

তাই কোনো বক্তব্য দেখলে প্রথমেই প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে তা সত্য কি না যাচাই করা প্রয়োজন। বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে বক্তব্যের যুক্তির উত্তর দেওয়া যেতে পারে। ভুল তথ্য থাকলে প্রমাণসহ সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু মানুষকে অপমান করা, গালি দেওয়া কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো কোনোভাবেই মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে না।

মতভিন্নতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সব বিষয়ে সবাইকে একমত হতে হবে—এমন কোনো বাস্তবতা নেই। বরং পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে ভিন্নমত সহ্য করার মানসিকতা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু সেই পার্থক্য যেন ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট না করে, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি।

মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে তাই যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—সত্যের ব্যাপারে দৃঢ় থাকা এবং মানুষের সঙ্গে আচরণে সুন্দর থাকা একই সঙ্গে সম্ভব। যুক্তি ও দলিলের সঙ্গে থাকতে পারে নম্রতা; মতের অমিলের মধ্যেও থাকতে পারে সম্মান; ভুলের প্রতিবাদের পাশাপাশি থাকতে পারে সংশোধনের সুযোগ।

আজকের বিভাজিত ও উত্তেজনাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে এই নববী আদর্শ অনুসরণ করা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যের মতকে নিজের মতের মতো মনে না হলেও তার মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। আর মতপার্থক্যের মধ্যেও ন্যায় ও সৌজন্য ধরে রাখাই হতে পারে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের একটি বাস্তব প্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান অর্জন, সত্যকে বোঝা এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে ন্যায়, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত