ইতালির শ্রেণিকক্ষে অভিবাসী শিশুতে ৩০ শতাংশ সীমা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতালির স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষে অভিবাসী শিশুর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করেছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন সরকার। একই সঙ্গে স্কুলে মেয়েদের বোরখা পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসী শিশুদের অভিভাবকদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও সামনে এসেছে।

ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা এসব প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তার মতে, অভিবাসী শিশুদের ইতালীয় সমাজে একীভূত করতে হলে ভাষা শেখানো এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিশুদের অনুপাত অতিরিক্ত হয়ে গেলে তাদের ইতালীয় ভাষা এবং দেশটির সামাজিক মূল্যবোধ শেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শ্রেণিকক্ষে অভিবাসী শিক্ষার্থীর সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা প্রয়োজন।

ভালদিতারা আরও বলেন, যেসব শিশু স্কুলে কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে না, তাদের অভিভাবকদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব তিনি দেবেন। তার যুক্তি, যেসব পরিবারে বাড়িতে ইতালীয় ভাষা খুব কম ব্যবহার করা হয়, সেখানে শিশুরা স্কুলে যা শেখে, বাড়ি ফিরে তা চর্চা না করার ঝুঁকি থাকে।

তার ভাষায়, অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা জানা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিদেশি শিশুদের অনেক অভিভাবকই স্কুলে নিয়মিত আসেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইতালির শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতালীয় শিশুদের স্কুলে অনুপস্থিতির হার প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যদিকে অভিবাসী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৬ শতাংশ।

তবে প্রস্তাবিত ৩০ শতাংশ সীমা কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আগামী শরতে শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র পরিষদ এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি সম্মেলনে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

অভিবাসন নীতির বিষয়ে ইতালির সরকার বলছে, দেশটি অভিবাসীদের স্বাগত জানায়। তবে নতুন করে আসা পরিবারগুলোকেও ইতালির ‘স্বকীয়তা ও মূল্যবোধ’ বুঝতে হবে এবং সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।

গত কয়েক দশকে ব্যাপক অভিবাসনের ফলে ইতালির জনসংখ্যার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় তুলনামূলকভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীপ্রধান দেশটি এখন ইউরোপের অন্যান্য বড় দেশের মতো ক্রমেই বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ইতালির স্কুলগুলোতে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার অ-ইতালীয় শিশু পড়াশোনা করছে। মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে তাদের অংশ প্রায় ১২ শতাংশ। দুই দশক আগে এই হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

দেশটির কিছু স্কুলে বিদেশি শিক্ষার্থীর অনুপাত জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে উত্তর ইতালির বিভিন্ন এলাকায় এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অর্থনীতির কারণে এসব অঞ্চল বেশি সংখ্যক অভিবাসী পরিবারকে আকৃষ্ট করে।

ইতালির স্কুলে পড়া অ-ইতালীয় শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। তাদের মধ্যে রোমানিয়া, আলবেনিয়া, ইউক্রেন ও মলদোভার শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

প্রায় ৩২ শতাংশ এসেছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। মরক্কো, মিসর, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া ও সেনেগাল তাদের অন্যতম উৎস। এশিয়া থেকে এসেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শিক্ষার্থী। এই অংশের মধ্যে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

লাতিন আমেরিকা থেকে এসেছে ৮ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ইকুয়েডর ও পেরুর শিশুর সংখ্যা বেশি।

তবে সরকারের প্রস্তাবের সবগুলোকে সমানভাবে সমর্থন করছে না শিক্ষক সংগঠনগুলো। সন্তানদের স্কুলে না পাঠালে অভিভাবকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে শিক্ষকদের ইউনিয়ন এফএলসি-সিজিআইএল।

ইউনিয়নটির বক্তব্য, অভিবাসী শিশুদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা একীভূতকরণের কার্যকর উপায় নয়। বরং এটিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে পরিবারগুলো স্কুলের কাছাকাছি আসার বদলে নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারে।

সমালোচকদের মতে, অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক মূল্যবোধের মতো বিষয়ে মেলোনির সরকার ক্রমেই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক ডানপন্থি পরিসরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী রাখতেও সরকার এসব ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে ইতালিতে কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানও আলোচনায় এসেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর সাবেক বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার রবের্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ফিউচার সাম্প্রতিক জরিপে জাতীয় ভোটের ৭ শতাংশের বেশি সমর্থন পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই সমর্থন ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক দ্য লিগের জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ভান্নাচ্চি চলতি সপ্তাহে তার দলের ইশতেহারের আরও কিছু বিষয় প্রকাশ করেছেন। এতে ইতালির শহরগুলোর রাস্তায় নিরাপত্তার জন্য সেনা মোতায়েন এবং স্কুলে সামরিক মূল্যবোধ শেখানোর প্রস্তাব রয়েছে।

তার দল কিশোর-কিশোরীদের জন্য বয়ঃসন্ধি বিলম্বিত করার চিকিৎসাপদ্ধতি ও লিঙ্গ পরিবর্তন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি গর্ভপাতের সুযোগ সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সমকামী যুগলদের সিভিল ইউনিয়ন বাতিল এবং অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নীতির কথাও ইশতেহারে রয়েছে।

মধ্য-বামপন্থি বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেসান্দ্রো জান ভান্নাচ্চির ইশতেহারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ‘প্রায় নাৎসিবাদের শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ইতালির স্কুলে অভিবাসী শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাব এখনো নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় অভিবাসী শিশুদের অংশগ্রহণ, একীভূতকরণ এবং বৈষম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত