যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে কানাডায় গেলেন ৪৮ শীর্ষ গবেষক

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৮ গবেষক কানাডায় পাড়ি জমাচ্ছেন। হার্ভার্ড, ইয়েল ও এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষকদেরসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসব বিজ্ঞানী ও গবেষককে নিয়োগ দিয়েছে কানাডার ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোট ৬৪ জন নতুন গবেষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ জন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কানাডায় যাচ্ছেন। অন্য ১৬ জন ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োগ পেয়েছেন।

গবেষকদের নিয়োগে কানাডা সরকার ৫০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

এই কর্মসূচি কানাডার উদ্ভাবন খাতে ১২০ কোটি কানাডীয় ডলারের বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ। আগামী বছর দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬৩ জন গবেষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং গবেষণা তহবিল নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়া বা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার কারণে গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিকেই কানাডা নিজেদের গবেষণা খাতকে শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরএনএ থেরাপিউটিকস ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ফিলিপ জামোরে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিচ্ছেন। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় মোট ছয়জন গবেষক নিয়োগ দিয়েছে।

জামোরে বলেন, তিনি এমন একটি দেশে বসবাস করতেন, যে দেশকে মানবজীবনের উন্নতিতে বিজ্ঞানের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম উৎসাহী দেশ মনে করতেন। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি বলেন, বিজ্ঞানীদের সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া জরুরি। বিজ্ঞান ও গবেষণার স্বাধীনতা রক্ষা না করা হলে সমাজের অন্য কেউ তা করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের সাবেক পুষ্টিবিজ্ঞানী কেভিন হলও কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ে তার গবেষণায় ফেডারেল কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ ও সেন্সরশিপের অভিযোগের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি বলেন, কিছু দেশ যখন গবেষণায় ব্যয় কমাচ্ছে এবং একাডেমিক স্বাধীনতা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, তখন কানাডা বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

নতুন গবেষক নিয়োগের এই কর্মসূচিকে তিনি বিশ্বের অন্যতম বড় ‘মেধা আকর্ষণ’ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও পরিবেশ প্রকৌশলের অধ্যাপক সেথ গুইকেমাও কানাডায় যাচ্ছেন। গবেষণা তহবিল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তিনি নতুন সুযোগ খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আগামী জানুয়ারিতে তিনি অন্টারিওর লন্ডনে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

গুইকেমা বলেন, প্রতিটি দেশ গবেষণার কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থায়ন করবে, সে বিষয়ে নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। তার মতে, সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কানাডা ভালো অবস্থানে রয়েছে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ও ছয়জন গবেষক নিয়োগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন এমআইটির কানাডীয় বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী সারা সিগার।

কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের আকর্ষণ করার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নিয়োগ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশটি নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিভা আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের কানাডায় যাওয়ার প্রবণতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা বাড়ায় কানাডাকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন অনেক গবেষক ও শিক্ষাবিদ।

একই সময়ে কানাডীয় বংশসূত্র প্রমাণ করতে পারা ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডার নাগরিকত্বের জন্যও বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের কারণে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকদের অন্য দেশে চলে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। অন্যদিকে কানাডার এই নিয়োগ কর্মসূচি দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্ভাবন খাতকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এই মেধা স্থানান্তরের প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গবেষণা অর্থায়ন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত