প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনে অটল রয়েছেন চা শ্রমিকরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রাগত সংকটের মধ্যে বর্তমান দৈনিক মজুরি দিয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের। দাবি আদায়ে টানা আট দিন ধরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকরা। চুনারুঘাট উপজেলার অন্তত ১৮টি চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে এই কর্মসূচি চলছে।
শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, তাদের দাবি দ্রুত মেনে নেওয়া না হলে আগামী দিনে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। অন্যদিকে চা বাগান মালিকপক্ষ বলছে, দেশের চা শিল্প বর্তমানে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, চায়ের বাজারমূল্য প্রত্যাশিত হারে না বাড়া, ব্যাংকঋণের চাপ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অনেক বাগান আর্থিক সংকটে রয়েছে।
দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেই হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে মজুরি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের প্রশ্ন, বর্তমান বাজারদরে মাত্র ১৮৭ টাকা দৈনিক আয় দিয়ে কীভাবে একটি পরিবার খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় নির্বাহ করবে? তাদের দাবি, ন্যায্য জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে মজুরি বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
চা শ্রমিকদের অভিযোগ, বাগানকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম জড়িয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক পরিবার চা বাগানে কাজ করছে। ভোর থেকে দিনের বড় একটি সময় মাঠে ও বাগানে কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের আয় সীমিত। রোদ, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে নিয়মিত কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। অথচ তাদের দাবি অনুযায়ী, শ্রমের তুলনায় প্রাপ্ত মজুরি এখনও অত্যন্ত কম।
বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এই পরিস্থিতিতে দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি একটি পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর তাদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৮৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সময়ের তুলনায় এখন বাজার পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে পুরোনো মজুরি কাঠামো দিয়ে জীবন চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে মজুরি আরও ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও শ্রমিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের বক্তব্য, সামান্য শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধি বর্তমান বাস্তবতায় কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তারা দৈনিক হাজিরা ৫০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিকদের মতে, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু শিল্পের আর্থিক পরিস্থিতি নয়, শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
চুনারুঘাটের চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার বলেন, চা শ্রমিকরা যুগের পর যুগ কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের জীবনমানের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। প্রতিদিনের শ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবার চালানো অত্যন্ত কঠিন।
তার ভাষ্য, চা শ্রমিকদের জীবন শুধু মজুরির প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মৌলিক সুবিধা নিয়েও অনেক শ্রমিক পরিবার সমস্যায় রয়েছে। বাগানকেন্দ্রিক শ্রমিকদের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও সব জায়গায় সেগুলো পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাইরুন আক্তার আরও জানান, শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। চান্দপুর চা বাগানে তার সঙ্গে গীতা রানী কানু, মোহন রবিদাসসহ ছাত্র, যুবক ও সাধারণ শ্রমিকরাও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
আন্দোলনের দৃশ্যপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শ্রমিক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। একজন শ্রমিকের আয়ের ওপর অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার নির্ভরশীল থাকে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে সীমিত আয়ের মধ্যে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়। শ্রমিকদের দাবি, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং মানবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
তবে চা বাগান মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে শিল্পের আর্থিক বাস্তবতার কথা সামনে এনেছে। তাদের দাবি, চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, কীটনাশক, পরিবহন, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেশি।
মালিকপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এক কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকারও বেশি হতে পারে, কিন্তু বাজারে চায়ের মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অনেক বাগান লোকসানের মুখে পড়ছে এবং নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তাদের বাগান প্রতিবছর লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের পরিমাণও বাড়ছে। উৎপাদিত চায়ের প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বাগানের আর্থিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।
নোয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থসংকটের কারণে একটি সময় কারখানার কার্যক্রম প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। পরে কারখানা চালু হলেও এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির জটিলতা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং চা শিল্পের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী মনে করেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, চা শ্রমিকরা প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাদের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের আয় নির্ধারণের সময় বর্তমান বাজারদর এবং একটি পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি। শুধু উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব নয়, শ্রমিকদের মানবিক জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
চা শিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী শিল্প। দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের ভূমিকা যেমন রয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবন-জীবিকাও জড়িত। তাই মজুরি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা শিল্প ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শ্রমিকদের কর্মবিরতির ফলে উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি নিয়ে অসন্তোষ চলতে থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়তে পারে। এ কারণে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। প্রয়োজন হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে। তাদের প্রত্যাশা, সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মালিকপক্ষ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
অন্যদিকে মালিকপক্ষও শিল্পের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। তাদের মতে, চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঋণসংকট এবং জ্বালানি সমস্যাসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে চলমান আন্দোলন এখন শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শ্রমিকদের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য জীবনযাত্রার দাবি, অন্যদিকে শিল্পের আর্থিক সংকট—দুই বাস্তবতার মধ্যে দ্রুত সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান বের করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এখন সবার নজর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার দিকে। শ্রমিকদের দাবি কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং চা শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে হবিগঞ্জের হাজারো চা শ্রমিক পরিবারের আগামী দিনের জীবন ও কর্মপরিবেশ।