লারাকে মার্কিন হামলা, জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার

**প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।**

দক্ষিণ ইরানের লারাক দ্বীপে এক মাসের মধ্যে প্রথমবার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রোববার ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তাদের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পানিশমেন্ট অব দ্য অ্যাগ্রেসর’। এই অভিযানে জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল আজরাক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।

আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় মার্কিন বাহিনীর কারিগরি ও মেরামত অবকাঠামো এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আইআরজিসির হামলার ঘোষণার পর জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। জর্ডানের পক্ষ থেকে কোনো সামরিক ঘাঁটিতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইরানি বাহিনী এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে। তেহরানের দাবি, প্রতিটি হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।

এর আগে রোববার দক্ষিণ ইরানের লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা চালানো হয়। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসের কাছাকাছি এবং হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে মাইনবাহী রকেট নিক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া কয়েকটি ইরানি লঞ্চারকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়।

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসকে হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক মাইনবাহী রকেট ছোড়ার প্রস্তুতি নিতে দেখার পর লারাক দ্বীপে দুটি ইরানি লঞ্চারে হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সামুদ্রিক চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন সক্ষমতা ধ্বংস করা।

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিরোধ চলছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি করছে। তেহরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানের অবরোধ সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক সুরক্ষায় হরমুজ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় তেলের দাম তুলনামূলকভাবে উঁচু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে চার ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উচ্চ জ্বালানি মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরোক্ষ বা সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে মার্কিন অস্ত্রভান্ডার ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর চাপ বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যেই অর্থনৈতিক চাপকে বিকল্প কৌশল হিসেবে জোরদার করা হচ্ছে।

তবে পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। এর ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।

ইরানও জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। তেহরান এর আগে মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের দুটি ঘাঁটিতে সর্বশেষ হামলা সেই একই প্রতিক্রিয়াশীল কৌশলের ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি। ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে হরমুজে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে চাইছে। বিপরীতে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ বন্ধ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতার দাবি জানিয়ে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা হামলা নতুন করে সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জর্ডানের মতো একটি মার্কিন মিত্র দেশের ভূখণ্ডে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই নয়, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সামরিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত