বিএনপি কার্যালয়ে হামলা: সোলায়মান ও মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
বিএনপি কার্যালয়ে হামলা: সোলায়মান ও মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা এবং দলটির কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক দুই সংসদ সদস্য সোলায়মান সেলিম ও ড. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। পল্টন থানায় দায়ের করা মকবুল হত্যা মামলা এবং বিএনপির কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় করা বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

সোমবার দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম পৃথক দুই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাদের করা আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে দুই আসামিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে সোলায়মান সেলিম ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের পক্ষে আইনজীবী শ্রী প্রাণ নাথ জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ওই আবেদনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাদের করা গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

দুই আসামি এরই মধ্যে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ফলে এখন এসব মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সংশ্লিষ্ট আইনগত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ঘটনাটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরের। ওই সময় বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির গণসমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যে ৭ ডিসেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকায় পুলিশ ও তৎকালীন সরকারি দলের অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এজাহার ও তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়েছে, ওই অভিযানের সময় নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয় এলাকায় গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ এবং টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। সংঘর্ষ ও অভিযানের একপর্যায়ে বিএনপিকর্মী মকবুল হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মকবুলের মৃত্যু তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সহিংসতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংঘর্ষের ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মকবুলের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ঘটনার পর মাহফুজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর মামলায় সাবেক দুই সংসদ সদস্য সোলায়মান সেলিম ও ড. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে দেওয়া আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সোলায়মান সেলিম ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের অবস্থানে থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল দমনের উদ্দেশ্যে অর্থের সংস্থান, নির্দেশনা এবং ঘটনার নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে আদালতের পর্যায়ে এসব অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।

সোলায়মান সেলিম ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দুজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা ও গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও তদন্ত এগিয়ে যাওয়ায় এসব মামলার বিচারিক অগ্রগতির দিকে রাজনৈতিক মহলেরও নজর রয়েছে।

নয়াপল্টনের ওই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীতে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে থাকে। সমাবেশের স্থান, নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছিল। এর মধ্যেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে।

মকবুল হোসেনের মৃত্যু সেই সংঘর্ষের সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর পরিবারের কাছে একটি সমাবেশ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত প্রিয়জন হারানোর ঘটনায় পরিণত হয়। তার মৃত্যুর পর পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর মামলাটি আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে দুই সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্য দিয়ে।

মামলার তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো এখন আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে যাচাই হবে। বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো মানেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, শুনানি এবং বিচারিক পর্যায়ে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের দায় নির্ধারিত হয়।

এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ প্রায়ই জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক তৈরি করে। তাই মামলার প্রতিটি ধাপে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই ন্যায়বিচারের জন্য অপরিহার্য।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ সোলায়মান সেলিম ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। আসামিপক্ষ জামিন চেয়েছে। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তদন্ত কর্মকর্তাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এর ফলে এখন মামলাগুলোর তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তি, তাদের কথিত ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো আরও খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে বিএনপির কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটিও একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বরের সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ ও অন্যান্য সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই মামলাতেও সাবেক দুই সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছিল এবং আদালত তা মঞ্জুর করেছেন।

একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোয় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। ঘটনার সময় কারা কোথায় ছিলেন, কার নির্দেশে কী ঘটেছিল, অর্থ বা সাংগঠনিক সহায়তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না এবং মকবুলের মৃত্যুর সঙ্গে অভিযুক্তদের কথিত ভূমিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের গুরুত্বও এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের তদন্ত বা বিচারকে প্রভাবিত না করে, একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন—দুই দিকই আইনের শাসনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সোমবারের আদালতের আদেশের মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের নয়াপল্টন সংঘর্ষ ও মকবুল হোসেন হত্যার মামলায় নতুন করে গতি এসেছে। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং আদালতের ভবিষ্যৎ আদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কতটা প্রমাণিত হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে পরবর্তী আইনি পরিণতি।

মকবুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় একটি পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, কোনো আইনি প্রক্রিয়াই তা পূরণ করতে পারবে না। তবে দীর্ঘ সময় পর মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নতুন করে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে এই মামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের অতীত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে জবাবদিহি, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত