মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় ২৪ লাখ ডলারের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় ২৪ লাখ ডলারের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের মাতৃ, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে ২৪ লাখ মার্কিন ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ২৯ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, বিশেষ করে দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে এসব সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাহিদা পূরণে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নবজাতকের উষ্ণতা ধরে রাখা, শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং টিকার কার্যকারিতা বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের সব অঞ্চলে সমান মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। রাজধানী ও বড় শহরগুলোর তুলনায় প্রত্যন্ত জেলা এবং দুর্গম অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি অনেক সময় চিকিৎসাসেবার মানকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে প্রসবকালীন জটিলতা, অপরিণত নবজাতকের পরিচর্যা কিংবা শিশুর তীব্র অপুষ্টির মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। এমন বাস্তবতায় নতুন এই সহায়তাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, সহায়তার আওতায় নবজাতকের শরীর উষ্ণ রাখার সরঞ্জাম এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তাকারী চিকিৎসা উপকরণ রয়েছে। জন্মের পরপরই অনেক নবজাতক শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না। আবার অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাসে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাতের কাছে থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে পারেন।

শুধু নবজাতক নয়, গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্যও এই সহায়তার আওতায় বিশেষ থেরাপিউটিক ফুড দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুপুষ্টির উন্নতিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। তবে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণ খাবারের পরিবর্তে চিকিৎসা-উপযোগী বিশেষ খাদ্য প্রয়োজন হয়। সময়মতো এ ধরনের পুষ্টি সহায়তা পাওয়া গেলে গুরুতর অসুস্থ শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে।

এ ছাড়া টিকার কার্যকারিতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উপকরণও সরবরাহ করা হবে। টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও পরিবহনের সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় না থাকলে কিছু টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে টিকাদান কর্মসূচিকে কার্যকর রাখতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন অর্থায়নে এফএইচআই ৩৬০, জেপিগো, জেএসআই এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গম এলাকাগুলোকে এই সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রাখার কথা জানিয়েছে মার্কিন দূতাবাস। ফলে সহায়তার সুফল শুধু রাজধানী বা বড় শহরের স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

সহায়তার প্রতীকী ও বাস্তবিক দিক তুলে ধরতে সোমবার পঞ্চগড় জেলা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। সেখানে তিনি মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ মডেল জেলা হাসপাতালের সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। এই প্রশিক্ষণ মডেলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের মতো সীমান্তবর্তী ও তুলনামূলকভাবে প্রত্যন্ত জেলার হাসপাতালগুলোতে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানো গেলে স্থানীয় জনগণকে অনেক ক্ষেত্রে রাজধানী বা বড় শহরে ছুটতে হবে না। বিশেষ করে প্রসবকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসা পাওয়া মা ও নবজাতক উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট গ্লোবাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কার্যক্রম ভূমিকা রাখছে। ওয়াশিংটন বলছে, দেশজুড়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, টিকাদান, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে শুধু সরঞ্জাম সরবরাহ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এসব সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নবজাতকের জীবন রক্ষায় কখনো কখনো একটি ছোট চিকিৎসা সরঞ্জামও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আবার গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহায়তা পাওয়া জীবন বাঁচানোর অন্যতম শর্ত হতে পারে। তাই নতুন সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হাসপাতাল পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো, নবজাতকের পরিচর্যা উন্নত করা এবং টিকাদানের আওতা ধরে রাখার বিষয়গুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া টেকসই অগ্রগতি কঠিন। এ কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনবল উন্নয়নের ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২৪ লাখ ডলারের এই সহায়তা সেই বৃহত্তর স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নবজাতকের জরুরি পরিচর্যা, শিশুর তীব্র অপুষ্টি মোকাবিলা এবং টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মতো ক্ষেত্রে সরাসরি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

সবশেষে এই সহায়তার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলো কত দ্রুত এবং সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, স্বাস্থ্যকর্মীরা সেগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মা যদি জটিল প্রসবের পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান, কোনো নবজাতক যদি সময়মতো শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তা পায় কিংবা অপুষ্টিতে ভোগা কোনো শিশু যদি প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে, তখনই এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মানবিক উদ্দেশ্য সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত