যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে আকস্মিক বন্যা, নিখোঁজ ১৫

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে আকস্মিক বন্যা, নিখোঁজ ১৫

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের বিশ্বখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কে আকস্মিক বন্যায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ১৫ জন নিখোঁজ বা নিখোঁজ হিসেবে বিবেচিত রয়েছেন। শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে মাত্র অল্প সময়ের তীব্র বৃষ্টির পর ভয়াবহ গতিতে নেমে আসা বন্যার পানিতে পার্কের দুর্গম অভ্যন্তরীণ অংশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে একাধিক হাঁটার সেতু, ভেসে গেছে পাথর ও ধাতব কাঠামো এবং কলোরাডো নদীতে জমেছে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ।

বন্যার পর থেকে জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ ও অ্যারিজোনা ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক সেফটি যৌথভাবে ব্যাপক উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গম গিরিখাতের ভেতরে আটকা পড়া পর্যটক, হাইকার ও ক্যাম্পারদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। রোববার সকাল পর্যন্ত অন্তত ৬২ জনকে দুর্গম এলাকা থেকে আকাশপথে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আরও কয়েকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।

বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যানিয়ন ও ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ এলাকায়। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের গভীরে অবস্থিত এসব স্থান সাধারণত হাইকার, ব্যাকপ্যাকার ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চল আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার প্রবল স্রোতে ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকের ওপর থাকা প্রায় সব হাঁটার সেতু ধ্বংস হয়েছে। ফলে ওই এলাকার বিভিন্ন অংশের মধ্যে স্বাভাবিক যাতায়াত কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি গিরিখাতের ভেতর দিয়ে প্রবল বেগে নেমে যাওয়ার সময় বড় বড় পাথর, গাছপালা, ধাতব কাঠামো এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ টেনে নিয়ে যায়। এসব ধ্বংসাবশেষ পরে কলোরাডো নদীতে গিয়ে পড়ায় নদীতে নৌযান চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বন্যায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পানির অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পার্কের পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির সরবরাহে ব্যবহৃত ট্রান্সক্যানিয়ন ওয়াটারলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানির মজুত নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক অবস্থান নিতে হয়েছে। এর ফলে পার্কের ভেতরে পানি ব্যবহারে সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানেও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার বন্যার সময় ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিক করিডোরে থাকা হাইকার ও ব্যাকপ্যাকারদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্যাম্পিংয়ের জন্য বুকিং করা ব্যক্তিদের হিসাব মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ হয়তো নিরাপদে অন্যত্র চলে গেছেন, আবার কারও সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে—তাই নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

রোববার বন্যার পানিতে ৪৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কলোরাডো নদীর কাছে ক্রিস্টাল র‍্যাপিডস এলাকায় মরদেহটি পাওয়া যায়। নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তিনি নিখোঁজদের তালিকায় ছিলেন কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষ তখন নিশ্চিত করেনি। তবে এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভয়াবহ বন্যার প্রাণঘাতী পরিণতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, মাত্র কয়েক মিনিটের তীব্র বৃষ্টিই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো খাড়া ও পাথুরে এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের কর্মকর্তা জাস্টিন জোহনড্রোর তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে আনুমানিক আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি বৃষ্টি হয়। এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে দ্রুত গিরিখাত ও ঝরনাধারার দিকে নেমে যায়।

ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকের ভূপ্রকৃতিও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। উত্তর রিম থেকে নেমে আসা এই জলধারা প্রায় ৬ হাজার ফুট উচ্চতার পার্থক্য অতিক্রম করে কলোরাডো নদীর দিকে চলে যায়। ফলে ওপরের দিকে ভারী বৃষ্টি হলে পানি অল্প সময়ের মধ্যেই নিচের দিকে প্রচণ্ড গতিতে প্রবাহিত হতে পারে। সংকীর্ণ গিরিখাতের ভেতর পানির প্রবাহ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠায় সেখানে অবস্থানরত মানুষের জন্য দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত থাকে।

বন্যার পর ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ, ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ড, ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ ক্যান্টিন ও কেবিন এবং নর্থ কাইবাব ট্রেইলের বড় অংশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কলোরাডো নদীর সংশ্লিষ্ট অংশে নৌযান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্ল্যাক ব্রিজ ও সিলভার ব্রিজসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পারাপারের পথও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকা কবে আবার পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

উদ্ধারকাজের পাশাপাশি আবহাওয়ার নতুন ঝুঁকিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সোমবার পর্যন্ত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এলাকায় আরও বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নতুন করে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, পাথরধস এবং নদী ও ট্রেইলের অবস্থার দ্রুত পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গিরিখাতের সরু অংশ ও শুকনো জলধারাগুলোতে হঠাৎ পানির স্রোত তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন প্রতিবছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। এর বিশাল পাথুরে দেয়াল, গভীর উপত্যকা এবং কলোরাডো নদীর প্রবাহ বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু একই ভূপ্রকৃতি সেখানে আকস্মিক বন্যাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তোলে। উপত্যকার গভীরে অবস্থানরত মানুষ অনেক সময় ওপরের দিকে বৃষ্টি শুরু হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন না। ফলে কয়েক মাইল দূরের বৃষ্টির পানিও মুহূর্তের মধ্যে নিচের গিরিখাতে প্রাণঘাতী স্রোত তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজদের সন্ধানে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উপায়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরিদর্শন এবং আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। নতুন করে বৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকারীদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থলকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের এই ঘটনা তারই ভয়াবহ উদাহরণ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত এখন উৎকণ্ঠার। কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত