ইন্দোনেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-মিত্রদের বড় সামরিক মহড়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
ইন্দোনেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-মিত্রদের বড় সামরিক মহড়া

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার এবং সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া। ‘সুপার গারুদা শিল্ড’ নামে পরিচিত এই বহুজাতিক মহড়ায় এবার যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ সেনাসদস্য অংশ নিচ্ছেন।

সোমবার শুরু হওয়া এই সামরিক মহড়া আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ও প্রশিক্ষণ এলাকায় মহড়ার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এতে স্থল, নৌ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বিত অনুশীলনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই মহড়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে চীনও তার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা জোরদার করে চলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও জনবহুল দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটি তার কূটনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাধীন ও সক্রিয়’ নীতি হিসেবে বর্ণনা করে। এর অর্থ হলো, কোনো নির্দিষ্ট বৃহৎ শক্তির সামরিক জোটে সরাসরি যুক্ত না হয়ে জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া চীনের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রেখেছে। চলতি মাসেই দেশটি চীনের সঙ্গে একটি যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। ওই মহড়াকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয় এবং তাইওয়ান এটিকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে সমালোচনা করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা যোগাযোগ দেশটির ভারসাম্য রক্ষার নীতিরই প্রতিফলন। জাকার্তা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না। ফলে একই সময়ে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে যৌথ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

সুপার গারুদা শিল্ড মহড়া ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার অন্যতম বড় আয়োজন। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা এবং কার্যক্রমের পরিধি বেড়েছে। শুরুতে মূলত দ্বিপক্ষীয় সামরিক প্রশিক্ষণ হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে এটি একটি বহুজাতিক প্রতিরক্ষা মহড়ায় পরিণত হয়েছে।

এবারের মহড়ায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যাপ্তিকে আরও বড় করেছে। পূর্ব তিমুর, ইতালি ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক সদস্য ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরছে।

যৌথ সামরিক মহড়ার মূল উদ্দেশ্য সাধারণত অংশগ্রহণকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা। ভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ইউনিট একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সক্ষমতা যাচাই করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক সংকট, সামুদ্রিক নিরাপত্তা কিংবা সামরিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে বহুজাতিক বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমের প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার মতো দ্বীপরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাজার হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটির বিস্তৃত সমুদ্রসীমা রয়েছে। জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ ধরা, মানবপাচার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ রক্ষার মতো বিষয়গুলো দেশটির নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

তবে এই মহড়ার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে তার সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থানের পর এই প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার যৌথ মহড়া সরাসরি কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত না হলেও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মহড়ার ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে ‘আগ্রাসন প্রতিহত’ করার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির আলোচনায় এই আয়োজন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ইন্দোনেশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। দেশটি কোনো পক্ষের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হতে চায় না, যাতে অন্য পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই কারণে জাকার্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

চলতি মাসে চীনের সঙ্গে যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নেওয়া এবং এর কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সুপার গারুদা শিল্ড আয়োজন ইন্দোনেশিয়ার সেই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশটি একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কাজ করে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে।

এ ধরনের সামরিক মহড়া শুধু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর কূটনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। একসঙ্গে প্রশিক্ষণ, সামরিক যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থা বাড়ে। একই সঙ্গে এটি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।

আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা সুপার গারুদা শিল্ড মহড়ায় বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক অনুশীলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সুমাত্রা ও বোর্নিওসহ ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যরা যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন। মহড়া শেষে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সামরিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হতে পারে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা শুধু স্থানীয় দেশগুলোর বিষয় নয়; বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হওয়া এই বহুজাতিক সামরিক মহড়াকে শুধু একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একদিকে এটি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও সমন্বয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র এবং ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণে শুরু হওয়া সুপার গারুদা শিল্ড আগামী দিনগুলোতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত