প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটার তালিকায় নতুন ভোটারের অন্তর্ভুক্তি এবং নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান ক্রমে কমে আসার বিষয়টি এবারের হালনাগাদ তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত নাগরিকদের তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫ জন। নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন। সব মিলিয়ে দেশের ভোটার সংখ্যা এখন প্রায় ১২ কোটি ৮৮ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যাগত ব্যবধান কমে আসা। বর্তমানে পুরুষ ও নারী ভোটারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৪৫ হাজার ৫৫৪ জনে। বাংলাদেশের ভোটার তালিকার ইতিহাসে নারী ভোটারের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় এই ব্যবধান কমছে বলে নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের ধারণা।
গত ১৪ মে প্রকাশিত প্রাথমিক ভোটার তালিকার সঙ্গে নতুন চূড়ান্ত তালিকার তুলনা করলে দেখা যায়, এর মধ্যে ৪ লাখ ৫ হাজার ৪০৩ জন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক নাগরিক ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ৩১ জুলাইকে ভোটার তালিকার ‘কাট-অফ ডেট’ ধরে আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ওই তারিখ পর্যন্ত যারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, তারাই বর্তমানে প্রস্তুত করা ভোটার তালিকার আওতায় রয়েছেন। এরপর যারা নতুন করে ভোটার নিবন্ধনের জন্য আবেদন করছেন বা ভবিষ্যতে নিবন্ধিত হবেন, তারা আপাতত আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না।
তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার নিবন্ধন কোনো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম। নতুন নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। ভবিষ্যতে কমিশন প্রয়োজন মনে করলে কাট-অফ তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে নতুনভাবে নিবন্ধিত ভোটারদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একটি নির্ভুল ও হালনাগাদ ভোটার তালিকার ওপর নির্ভর করে সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী এলাকার প্রশাসনিক প্রস্তুতি। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশকে নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ভোটার তালিকা প্রকাশ হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা তফসিল নিয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি রয়েছে। তবে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলে তা যথাসময়ে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের বিভিন্ন মৌলিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন কবে এবং কোন পর্যায় থেকে শুরু হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ রয়েছে।
ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইসি সচিব জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারের কোন স্তরের নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, তার ওপর ভিত্তি করেই ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশন—কোন নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হবে, তা স্পষ্ট হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা চূড়ান্ত করবে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। ১২ কোটির বেশি ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সামগ্রী প্রস্তুত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বড় শহর পর্যন্ত ভোটারদের নিরাপদ ও সহজভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
নারী ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিও বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। অতীতে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে অনেক নারী ভোটার নিবন্ধনের বাইরে থাকতেন। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী ভোটারের সংখ্যা বাড়ছে। এতে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও ভোটার হিসেবে তাদের স্বীকৃতি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে যোগ্য প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনা আরও বাড়তে পারে। ভোটার তালিকা প্রস্তুত হওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে এবং তফসিল কবে ঘোষণা করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অপেক্ষমাণ।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো এই বিপুলসংখ্যক ভোটারের জন্য কার্যকর ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনী প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা, নির্বাচনী সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন ভোটারের তথ্য এখন নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তালিকা দেশের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। কবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে, কোন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে এবং নতুন ভোটারদের ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্তির জন্য কাট-অফ তারিখে কোনো পরিবর্তন আনা হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কমিশনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর।