প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়া এবার আগের তুলনায় এগিয়ে আনা হয়েছে। আগামী ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আবেদন গ্রহণ চলবে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের কলেজ ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণির নিয়মিত ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষাবোর্ডগুলোর প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী, এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীদের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে। এ জন্য কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের পর শিক্ষার্থীর ফলাফল, পছন্দক্রম এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তির জন্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হবে।
এবারের ভর্তি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের জন্য সময়সূচি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবেদন করার সুযোগ থাকবে নির্দিষ্ট কয়েক দিন। ফলে পছন্দের কলেজে ভর্তির প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য যারা আবেদন করেছেন, তাদেরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রাথমিক আবেদন করতে হবে।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পুনর্নিরীক্ষণের পর যেসব শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হবে, তাদের জন্য পরবর্তী সময়ে আবার আবেদনের সুযোগ রাখা হবে। প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর পরিবর্তিত ফল পাওয়া শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পরদিন, অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়ার কথা।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো শিক্ষার্থী কলেজে মনোনয়ন না পেলে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান না পেলে কিংবা কোনো কারণে আবেদন করতে না পারলে তাদের জন্যও পরবর্তী সময়ে আবেদনের সুযোগ রাখা হবে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।
কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভর্তি-ইচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত ফি দিয়ে সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পছন্দক্রম অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে। শিক্ষার্থীর এসএসসি বা সমমানের ফলাফল, পছন্দের ক্রম এবং প্রযোজ্য কোটা বিবেচনা করে একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে।
কয়েক বছর ধরে দেশে এই কেন্দ্রীয় ভর্তি পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর ফলে আলাদা আলাদা কলেজে গিয়ে আবেদন করার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে আবেদন করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পছন্দ দিতে পারেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের ভর্তি-সংক্রান্ত ফলাফল জানতে পারেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কেন্দ্রীয়ভাবে এই অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
দেশের অধিকাংশ কলেজ ও মাদরাসায় এই সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থা কার্যকর হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নিয়মে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজসহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে।
এদিকে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ভর্তি ফি ও অন্যান্য ব্যয়ের কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত ভর্তি নীতিমালায় প্রতিষ্ঠানভেদে ভর্তি ফি ও সেশন চার্জের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির অবস্থা, অবস্থান এবং বাংলা বা ইংরেজি ভার্সনের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবার একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন আবেদনের জন্য শিক্ষার্থীদের ২২০ টাকা ফি দিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত বিভিন্ন ফি ও চার্জ মিলিয়ে প্রাথমিক নিশ্চায়নের সময় মোট ৩৪০ টাকা নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রেজিস্ট্রেশন, ক্রীড়া, রোভার বা রেঞ্জার, রেড ক্রিসেন্ট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিএনসিসি এবং শিক্ষককল্যাণ ও অবসরসুবিধা-সংক্রান্ত ফি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা ভর্তি ফিও দিতে হবে। এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর ক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর এলাকায় বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভার্সনের জন্য ভর্তি ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য মহানগর এলাকায় এই ফি ৩ হাজার টাকা, জেলা পর্যায়ে ২ হাজার টাকা এবং উপজেলা ও মফস্বল এলাকায় ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নন-এমপিও বা আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ফি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর এলাকার এসব কলেজে সর্বোচ্চ ভর্তি ফি প্রযোজ্য হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন অনুযায়ী আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোটার বিষয়টিও এবার আলোচনায় রয়েছে। শিক্ষাবোর্ডগুলোর প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালায় মোট আসনের ৭ শতাংশ কোটা রাখার কথা বলা হয়েছে। বাকি ৯৩ শতাংশ আসন সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ২ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের প্রেক্ষাপটে এবারের একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বেশি। এ বছর ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে। গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছরের ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশের তুলনায় কম।
জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও এবার কমেছে। চলতি বছর মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২। অর্থাৎ এবার পাসের হার ও সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই পতন হয়েছে।
এরই মধ্যে ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন পড়েছে। চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে এবং এসব শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে প্রায় ১৩ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। তাত্ত্বিক পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য ১০ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতার জন্য ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি আবেদন পড়েছে।
ফলে পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফলও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময়সূচির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। যেসব শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হবে, তাদের জন্য নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ফল সংশোধনের পর শিক্ষার্থীরা পরিবর্তিত ফলের ভিত্তিতে পছন্দের কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এসএসসি পেরিয়ে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পাশাপাশি এ পর্যায় থেকেই উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু হয়। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাগত ও পেশাগত সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই কলেজ নির্বাচন, বিষয় নির্বাচন এবং পছন্দক্রম নির্ধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
নতুন সূচি অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর আবেদন শুরু হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হাতে সময় থাকবে মাত্র কয়েক দিন। এ কারণে ফলাফল, পছন্দের কলেজ, ভর্তির যোগ্যতা ও নির্ধারিত ফি সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করাই হবে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেই নতুন শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে। এসএসসি-পরবর্তী দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিক্ষার্থীরা তখন শুরু করবে তাদের শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায়। ফলাফল, পছন্দ ও প্রতিযোগিতার নানা হিসাব পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত কলেজে জায়গা করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাদের উচ্চমাধ্যমিকের পথচলা।