মোদির ‘উন্নত ভারত’ স্বপ্নে বাড়ছে বাস্তবতার ফারাক

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৭ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে একটি ‘উন্নত রাষ্ট্রে’ পরিণত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ক্রমেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছালেও, এই হার ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত ভারতের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

ভারতের শীর্ষ সরকারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নীতি আয়োগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অশোক লাহিড়ীর হিসাব অনুযায়ী, ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে ভারতকে আগামী ২১ বছর ধরে প্রতি বছর গড়ে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার থেকে আরও উল্লেখযোগ্যভাবে গতি বাড়াতে হবে দেশটিকে।

ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার শতবর্ষে, অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা। কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান কাঠামো, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের চিত্র বলছে, সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশটির বর্তমান সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ গত ৫০ বছরে ভারত মাত্র তিনবার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে—১৯৭৫, ১৯৮৮ ও ২০২১ সালে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ আলেকজান্দ্রা হারমান প্রসাদের মতে, মোদির লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতের প্রবৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী গতি প্রয়োজন। তবে অর্থনীতির আকার যত বড় হবে, ততই দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।

চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে সরকার আশাবাদী। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সম্প্রতি বলেছেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ বা তার বেশি থাকবে। এই পূর্বাভাস রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি।

তবে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ শুধু প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে নয়। ভারতের মাথাপিছু আয়ও উন্নত দেশের মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে। নীতি আয়োগের কর্মকর্তা অশোক লাহিড়ীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৮১৩ মার্কিন ডলার। ২০৪৭ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশের সীমা অতিক্রম করতে হলে এই আয় প্রায় ছয় গুণের বেশি বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলারে নিতে হবে।

এখানেই ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের নিচে দীর্ঘদিন থাকলে ভারত ‘মাঝারি আয়ের ফাঁদে’ আটকে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা যথেষ্ট বাড়ার আগেই মজুরি বৃদ্ধি পেলে একটি দেশ কম খরচে উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে।

বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপও ভারতের প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা। ওভারসি-চায়নিজ ব্যাংকিং কর্পোরেশনের অর্থনীতিবিদ লাবণ্য ভেঙ্কটেশ্বরন ভারতের চলতি হিসাব ও বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে অস্থির মূলধন প্রবাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

এর প্রভাব ভারতের মুদ্রাবাজারেও দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় রুপি চলতি বছরে এশিয়ার দুর্বল পারফর্ম করা মুদ্রাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পছন্দের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

উৎপাদন খাতের স্থবিরতাও ভারতের উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মোদি সরকার দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খাতের প্রসারকে অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশ প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা।

বৈশ্বিক বাণিজ্যেও ভারতের অবস্থান এখনও সীমিত। বিশ্ব পণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ ২ শতাংশেরও কম, যেখানে চীনের অংশ ১৪ শতাংশের বেশি। ফলে শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে ভারতের সামনে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। উৎপাদন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও ভারতের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

ভারত বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেও সেই বিনিয়োগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির স্টার্টআপ খাতে আগে বিনিয়োগ করা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নিচ্ছে। ফলে নিট এফডিআই প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। ভারতের সঞ্চয়ের হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি হলেও এশিয়ার কয়েকটি প্রতিযোগী অর্থনীতির তুলনায় তা পিছিয়ে। চীনের তুলনায় ব্যবধান আরও বড়।

কম আয়ের কারণে ভারতের অনেক পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় করার সুযোগ সীমিত। অথচ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় নতুন কারখানা, অবকাঠামো ও অন্যান্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক সস্তা অর্থের উৎস হিসেবে কাজ করে। সঞ্চয় কমে গেলে প্রবৃদ্ধির অর্থায়নে ব্যয়বহুল ঋণ অথবা বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও মোদির উন্নত ভারতের স্বপ্নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। ভারতের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। অন্যথায় দেশটির সম্ভাব্য ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে।

নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২০২১ সালের জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় কোনো কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। একই সঙ্গে মানসম্মত চাকরির অভাবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আত্মকর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল, যার উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষির মতো অপেক্ষাকৃত কম আয়ের খাতে যুক্ত।

গ্লোবালডাটা.টিএস লম্বার্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ শুশমিতা দেবেশ্বরও ভারতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ চক্র কেন শক্তিশালী হচ্ছে না এবং তরুণ ও ক্রমবর্ধমান কর্মীবাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান কেন তৈরি হচ্ছে না—এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দ্রুত না বাড়লে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। আর ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে যে ৮ শতাংশের বেশি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৯ শতাংশের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, সেটি অর্জন আরও কঠিন।

ফলে ভারতের বর্তমান ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার ইঙ্গিত দিলেও, মোদির ‘বিকশিত ভারত’ লক্ষ্য পূরণের জন্য শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির একটি বা কয়েকটি প্রান্তিক ফল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্যাপক মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

২০৪৭ সালের লক্ষ্য এখনো দুই দশকের বেশি দূরে। কিন্তু অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা আরও কঠিন হবে। তাই মোদির দেখানো উন্নত ভারতের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরে পরিণত করা যায়।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত