প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছে। তুলনামূলক মূল্য, সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় চীনের জে-১০কে বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, একই ধরনের সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে কম খরচে কেনা সম্ভব। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা বিকল্পের খরচ অর্ধেকেরও কম হতে পারে এবং কোনো কোনো হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি হতে পারে।
তবে যুদ্ধবিমানের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে শুধু উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্য বিবেচনা করা হয় না। অস্ত্র ও গোলাবারুদ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়সহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিমানের ব্যয় তুলনা করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্যাকেজ বিবেচনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতার প্রসঙ্গও প্রেস ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে থাকা মিগ-২৯ এখন খুব অল্পসংখ্যক রয়েছে এবং সেগুলোর সবগুলো পুরোপুরি কার্যকর অবস্থায় নেই। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমানগুলোও বেশ পুরোনো।
এই বাস্তবতায় বিমানবাহিনীর সক্ষমতা আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বহুমুখী বা মাল্টিরোল ফাইটারের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল’-এর অংশ। অর্থাৎ এটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনার মধ্যেই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘ফোর্সেস গোল’ মূলত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামো, সক্ষমতা, আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তন অনুযায়ী এই পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন হয়। আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহও সেই বৃহত্তর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমানকে কেন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে উপদেষ্টা মূলত ব্যয় ও সক্ষমতার তুলনার কথা উল্লেখ করেছেন। আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার হিসেবে জে-১০ বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে কোনো যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সরবরাহকারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্রব্যবস্থা এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিমানবাহিনীর পুরোনো প্ল্যাটফর্মগুলো ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কারণে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলোর পরিচালন সক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে পুরোনো প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত করার বিষয়টি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি অতীতে মিগ-২৯ কেনার সময় দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সে সময় মামলা ও বিভিন্ন ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে এবার সরকার এ ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে।
সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এ ধরনের চুক্তিতে শুধু ক্রয়মূল্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে চুক্তির শর্তও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করা হয়। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, যদি এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে সরকারই তা জানাবে। এ ধরনের চুক্তি গোপন রাখার বিষয় নয় এবং সরকার চুক্তি করলে তা অবশ্যই প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান।
জে-১০ কেনার পরিকল্পনা এবং বোয়িং কেনার সম্ভাব্য চুক্তি—দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের বিমান সক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে সামরিক বিমানবাহিনীর সক্ষমতা আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতেও নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। তবে দুই ধরনের ক্রয় সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিমানবাহিনীর পুরোনো বহরকে ধীরে ধীরে আধুনিক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে সেই আধুনিকায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শুধু নতুন যুদ্ধবিমানের সংখ্যার ওপর নয়; প্রশিক্ষিত জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, অস্ত্র ও রাডার প্রযুক্তি এবং সামগ্রিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সক্ষমতার ওপরও।
চীনা জে-১০কে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে তাই শুধু ক্রয়মূল্য নয়, পুরো জীবনচক্রের ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি বা যুদ্ধবিমানের নির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত ঘোষণা আসেনি। ফলে জে-১০ কেনার বিষয়টি আপাতত পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের পর্যায়েই রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চললেও এ ধরনের বড় সামরিক ক্রয় সবসময়ই জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে প্রযুক্তিগত প্রয়োজন, ব্যয়, স্বচ্ছতা এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশলের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জে-১০ যুদ্ধবিমান নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর ভবিষ্যৎ আধুনিকায়ন পরিকল্পনাও যুক্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোন যুদ্ধবিমান কেনা হবে, কতটি কেনা হবে এবং কী ধরনের প্যাকেজে কেনা হবে—এসব বিষয়ে সরকারি ঘোষণা ও আনুষ্ঠানিক চুক্তির তথ্যই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির পরিষ্কার চিত্র দেবে।