ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে জনপ্রতি ব্যয় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে জনপ্রতি ব্যয় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কর্মহীন তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বড় পরিসরে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ৫০ হাজার ১০০ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প, যেখানে একজন প্রশিক্ষণার্থীর পেছনে সরকারের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩৪৭ টাকা।

বেসরকারি পর্যায়ে তুলনামূলক কম খরচে একই ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ থাকায় সরকারি প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তিন মাসের একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য জনপ্রতি এত বড় অঙ্কের ব্যয় কতটা যৌক্তিক এবং এর মাধ্যমে বাস্তবে কতজন তরুণ দীর্ঘমেয়াদে আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারবেন।

সরকারের প্রস্তাবিত উদ্যোগটি পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে দেশের কর্মহীন তরুণ ও তরুণীদের ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে অনলাইনভিত্তিক আয়ের সুযোগ তৈরি করাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের ৫০১টি ওয়ার্ড থেকে কর্মহীন যুবক ও যুব নারীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। মোট ৫০ হাজার ১০০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ জন্য ২ হাজার ৪টি ব্যাচ গঠন করা হবে এবং প্রতিটি ব্যাচে ২৫ জন করে প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেবেন।

বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত চাকরির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট তৈরি এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে এ খাতের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই। তবে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি এখন মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করবে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় এর প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের বিভিন্ন খাত, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং সম্ভাব্য সুফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পিইসি পর্যায়ে অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠানো হতে পারে।

পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পটি মূল্যায়নের সময় চলমান অন্যান্য ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। একই ধরনের একাধিক প্রকল্প থাকলে সেগুলোকে একীভূত করে ব্যয় কমানো সম্ভব কি না, প্রশিক্ষণের মেয়াদ আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা যায় কি না এবং পরামর্শক ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটা—এসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের যুক্ত করার ব্যবস্থা। কারণ, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই একজন তরুণের আয় নিশ্চিত হয় না। ফ্রিল্যান্সিং খাতে সফল হতে হলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, বিদেশি ও স্থানীয় ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা, পেশাগত আচরণ, ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা।

প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা, ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ছয় মাসের মধ্যে আয় শুরু করাতে সহায়তা করা এবং অন্তত ৬০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীকে আয়মূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নই হবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ফ্রিল্যান্সিং খাতে আয় নির্ভর করে ব্যক্তির দক্ষতা, কাজের মান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতার ওপর। ফলে প্রশিক্ষণ শেষ করেই সবাই সমানভাবে আয় করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সেটি নয়; বরং কতজন নিয়মিত আয় করছেন এবং কতদিন ধরে পেশাগতভাবে এ খাতে টিকে থাকতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরাও। তাদের মতে, বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ে বিপুল পরিমাণ শিক্ষাসামগ্রী বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রাথমিক থেকে উন্নত পর্যায়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুরের মতে, ফ্রিল্যান্সিং শেখার জন্য বিপুল সরকারি ব্যয় অপরিহার্য নয়। ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম খরচেও দক্ষতা অর্জন সম্ভব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে তুলনামূলক কম খরচে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মোট ব্যয়কে শুধু প্রশিক্ষণ ফি হিসেবে বিবেচনা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ পরিচালনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের খাবার, প্রতিদিনের যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে প্রতিদিন ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে একজন প্রশিক্ষণার্থীর পেছনে যে মোট ব্যয়ের হিসাব দাঁড়িয়েছে, তার সবটাই সরাসরি প্রশিক্ষক বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যয় হবে না। অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন সুবিধাও প্রকল্প ব্যয়ের অংশ হতে পারে।

তারপরও বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয় খাত জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হলে ব্যয় নিয়ে বিতর্ক কমবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মান, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের বাস্তব ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও এ খাতে টেকসই সাফল্যের জন্য শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা নির্বাচন, বাস্তব প্রকল্পে কাজের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের পোর্টফোলিও তৈরির ব্যবস্থা থাকলে প্রশিক্ষণার্থীদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এ ধরনের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বাস্তব কর্মসংস্থান ও আয় নিশ্চিত করা। একজন প্রশিক্ষণার্থীকে তিন মাসের কোর্স শেষ করিয়ে সনদ দেওয়ার চেয়ে তাঁকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তিনি নিজ দক্ষতায় নিয়মিত আয় করতে পারবেন।

৫০ হাজারের বেশি কর্মহীন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বড় পরিসরের একটি পরিকল্পনা। কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ব্যয়ের যৌক্তিকতা, প্রশিক্ষণের গুণগত মান, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের আয়মূলক কাজে যুক্ত করার সক্ষমতার ওপর।

সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে যদি প্রকল্পটি বাস্তব দক্ষতা ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে এটি দেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। অন্যদিকে ব্যয় বেশি হলেও যদি প্রশিক্ষণ শেষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণকারী আয়মূলক কাজে যুক্ত না হন, তাহলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয় কাঠামো ও প্রত্যাশিত ফলাফল আরও গভীরভাবে যাচাই করার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত