প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা করতে আগ্রহী কানাডীয় কোম্পানিগুলোকে তাদের সদর দপ্তর ও উৎপাদন কার্যক্রম ‘অবিলম্বে’ যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এলে এসব কোম্পানিকে নতুন শুল্ক দিতে হবে না।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, নতুন শুল্ক এড়াতে আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা করা কানাডীয় কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসা উচিত। নতুন শুল্ক ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা করা সব কানাডীয় কোম্পানির অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা উচিত। তাঁর ভাষ্য, কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বোকা নেতৃত্বের’ কারণে অনেক কোম্পানি দেশটির বাইরে চলে গিয়েছিল। এসব কোম্পানি ফিরে এলে কোনো শুল্ক দিতে হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্পের এই বক্তব্য সামনে এলো। এর আগে তিনি কানাডার দুগ্ধপণ্য ও কাঠসহ কয়েকটি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। কানাডীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যবিরোধের জন্য তারা প্রস্তুত।
অন্য একটি পোস্টে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ‘সবচেয়ে খারাপ’ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবেও আখ্যা দেন ট্রাম্প। অথচ বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক থেকে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি কানাডার গাড়ি বা যন্ত্রাংশ চান না। তাঁর অভিযোগ, কানাডা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা নিয়েছে। এখন সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, তাঁর শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পকে সুরক্ষা দিয়েছে। তবে বাস্তবে দেশটির গাড়ি নির্মাতারা এখনো কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে নতুন করে শুল্ক বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন প্রশাসন কিছু গাড়ির যন্ত্রাংশকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় ফোর্ড কর্তৃপক্ষ ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে নতুন দফার শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্প শেষ পর্যন্ত কতটা ক্ষতির মুখে পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও কঠিন পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কানাডার সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহের চেয়ে চাপ প্রয়োগের কৌশলেই বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বিরোধও তীব্র হয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থাগুলোকে লেক অন্টারিওকে ‘লেক আমেরিকা’ নামে উল্লেখ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কানাডার ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কানাডায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড রোববার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এবিসির ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ফোর্ড বলেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে অনেক মানুষ নিজেদের নিপীড়িত মনে করছেন। তাঁর ভাষায়, এটি মার্কিন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত হতে পারে এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য তিনি বুঝতে পারছেন না। লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের উদ্যোগকেও তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, কেউ ওই জলভাগকে ‘লেক আমেরিকা’ নামে ডাকবে না।
এর আগেও ফোর্ড ট্রাম্পকে ‘বুলি’ ও ‘লুজার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
ম্যানিটোবার প্রিমিয়ার ওয়াব কিনিউও ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি কানাডা সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিনিউয়ের মতে, এক বছর আগের তুলনায় বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন দুর্বল। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ট্রাম্প এ সমস্যা সম্পর্কে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে কানাডার পাল্টা শুল্কের জবাব দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কানাডা আরও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার কানাডার একটি সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেছেন, কানাডার পক্ষ থেকে আরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র চুপ করে থাকবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কানাডার জনগণের অসন্তোষ সম্পর্কে ওয়াশিংটন অবগত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব বাণিজ্যনীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে এবং দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।
দুই দেশের অর্থনীতি ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু সরকার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গাড়ি, যন্ত্রাংশ, শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ আহ্বান তাই কানাডীয় কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। শুল্কের চাপ বাড়তে থাকলে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সরিয়ে নেবে কি না এবং দুই দেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ কমাতে পারবে কি না, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।