তিন মাস পর ৫০ মিলিয়ন ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাজারে ডলারের দর কমতে থাকায় প্রায় তিন মাস পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে নিলামের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাটি কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে সর্বশেষ গত ২০ মে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকারদের মতে, বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এর দর কমছিল। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও তুলনামূলক দুর্বল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডলারের দর আরও কমে যাওয়া ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

মঙ্গলবার সকালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের দর তুলনামূলক কম ছিল। ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউজ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৪০ পয়সা দরে কিনছিল। অন্যদিকে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সার মধ্যে।

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কেনায় বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা গেছে। এতে ব্যাংকারদের ধারণা হয়েছে, ডলারের দর এই স্তরের নিচে নামতে দেওয়া হবে না।

তাঁর মতে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ডলারের দর কমে যাওয়ার সময়ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ধারণা করেছিল যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতে পারে। তবে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনেনি।

ব্যাংকাররা জানান, গত মাসের ২০ তারিখের পর সরকারি এলসি পরিশোধের সঙ্গে নতুন করে আরও ১০ কোটি ডলারের অর্থ পরিশোধের চাপ যুক্ত হয়। এর ফলে সরকারি পেমেন্টের মোট চাপ ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় বাজারে সরকারি বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনা থেকে বিরত ছিল বলে ধারণা করছেন তারা।

এদিকে গত ১৫ দিনে ডলারের দর বেশ কয়েকবার ওঠানামা করায় ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমদানিকারকদের একটি অংশ ভবিষ্যতের বিনিময় হার নিয়ে ঝুঁকি কমাতে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে অনুরোধ করছেন।

বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। পাশাপাশি আমদানি ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তির চাপও আগের তুলনায় কমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকায় আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও তুলনামূলক কম রয়েছে।

ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় এর দাম কমছিল। ব্যাংকারদের ধারণা, এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বিনিময় হার যেন অতিরিক্ত কমে না যায়, তা নিশ্চিত করা।

তবে আগামী মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কয়েকটি অর্থ পরিশোধ করবে। এ কারণে ওই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। ফলে সামনে ডলারের বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।

মঙ্গলবারের ডলার কেনার সিদ্ধান্তের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগেভাগে বাজারে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। একজন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনবে—এমন কোনো তথ্য সকাল পর্যন্ত বাজারে ছিল না।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডলার কেনার বিষয়টি জানানো হয়। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনলে সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়।

ফলে মঙ্গলবার সকালে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের এলসি নিষ্পত্তি করে। এসব এলসিতে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। একই সময়ে রেমিট্যান্সের ডলারও তুলনামূলক কম দামে কেনা হচ্ছিল।

দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কেনার তথ্য জানালে বাজারে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। বিকেলে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক একই ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে রেমিট্যান্সের ডলার কেনার পাশাপাশি ওই দরেই এলসি নিষ্পত্তি করে।

ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনার ফলে বাজারে একটি মূল্যস্তর সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছে। ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা ব্যাংকগুলোকে ইঙ্গিত দিয়েছে যে এর চেয়ে কম দামে বাজারে ডলার বিক্রির প্রবণতা নিরুৎসাহিত হতে পারে।

আরেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলার কেনার নিলামের তথ্য যদি আগে থেকেই জানা থাকত, তাহলে সকালে কোনো ব্যাংক এত কম দামে রেমিট্যান্সের ডলার কিনত না কিংবা ওই দরে এলসি নিষ্পত্তি করত না।

তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহের রোববার থেকে ডলারের দর আবার কমতে শুরু করেছিল। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছিল না। ফলে ডলারের দর শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে গিয়ে স্থির হবে, তা নিয়ে বাজারে স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

সাম্প্রতিক ওঠানামার চিত্রও বাজারের অনিশ্চয়তাকে স্পষ্ট করছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। এর আগে দুই সপ্তাহ আগে তা কমে ১২২ টাকায় নেমে এসেছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে ডলারের দরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ডলার কেনার ফলে এখন বাজারে এর প্রভাব কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডলারের সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, সরকারি বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নির্ভর করবে সামনে বিনিময় হার কোন দিকে যায়।

একদিকে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ ও কম চাহিদা থাকলে দর কমার চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকারি পেমেন্ট বা আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলারের চাহিদা আবার বাড়তে পারে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজারে উপস্থিতি বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

প্রায় তিন মাস পর ৫০ মিলিয়ন ডলার কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত বাজারে ডলারের নিম্নমুখী প্রবণতা ঠেকানোর একটি সংকেত দিয়েছে। তবে আগামী দিনগুলোতে সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে ডলারের দর এই স্তরে স্থির থাকে, নাকি আবার ওঠানামা শুরু করে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত