সর্বশেষ :

টিকিট কালোবাজারির প্রতিবাদে যাত্রীকে মারধরের অভিযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার
টিকিট কালোবাজারির প্রতিবাদে যাত্রীকে মারধরের অভিযোগ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারির প্রতিবাদ এবং অনিয়মের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করাকে কেন্দ্র করে এক তরুণ যাত্রীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি স্থানীয় যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, টিকিট সংগ্রহের সময় অনিয়মের প্রতিবাদ করায় কাউন্টারের আশপাশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ওই যাত্রীর ওপর হামলা চালান। পরে আরও কয়েকজন এসে তাকে কিল-ঘুষি ও মারধর করেন বলে দাবি ভুক্তভোগীর।

এ ঘটনায় শুধু একজন যাত্রী মারধরের অভিযোগই নয়, মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত টিকিট কালোবাজারি ও অনিয়মের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, কাউন্টারে নিয়মিত টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও ট্রেন ছাড়ার সময় একই টিকিট কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে স্টেশন কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের কর্মীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং অনলাইনে কেনা টিকিট বাইরে বেশি দামে বিক্রি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

ভুক্তভোগী যাত্রীর নাম রিয়াদ আহমেদ (২২)। তিনি মোহনগঞ্জ উপজেলার মাঘান গ্রামের বাসিন্দা এবং মো. আলমগীরের ছেলে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৪ আগস্ট দুপুরে মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে ‘মহুয়া কমিউটার’ ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি ঘটনার শিকার হন।

রিয়াদ আহমেদ বলেন, কাউন্টার খোলার আগেই তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ভাষ্য, কাউন্টার খোলার পরপরই টিকিট মাস্টারদের পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করে দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করেন। এতে লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা সাধারণ যাত্রীরা টিকিট পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, লাইনে থাকা এক নারী যাত্রীর কাছ থেকে দুটি টিকিটের জন্য নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত ৫০ টাকা নেওয়া হয়। বিষয়টি দেখে তিনি প্রতিবাদ করেন এবং অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন।

রিয়াদের দাবি, ভিডিও ধারণ শুরু করার পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কাউন্টারের আশপাশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। এরপর তাদের ইন্ধনে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল এসে তাকে কিল-ঘুষি ও মারধর করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জীবন বাঁচাতে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাকে সেখান থেকে সরে যেতে হয় বলে জানান তিনি।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে বলে জানা গেছে। তবে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কথিত টিকিট সিন্ডিকেট বা হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই ঘটনার পর মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আবারও সামনে এসেছে। নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াতকারী অনেকের অভিযোগ, টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েও তারা প্রায়ই টিকিট পান না। অথচ ট্রেন ছাড়ার কাছাকাছি সময়ে একই টিকিট অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়।

ওয়ালী উল্লাহ সাদী নামের এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, মোহনগঞ্জ স্টেশনে টিকিট সিন্ডিকেটের বিষয়টি অনেকদিনের সমস্যা। তার দাবি, কাউন্টারে নির্ধারিত দামে টিকিট পাওয়া যায় না, কিন্তু পরে একই টিকিট কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রির ঘটনা ঘটে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ টাকার একটি টিকিট কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রেন ছাড়ার সময় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঈদসহ বড় ছুটির সময় যাত্রীদের চাপ বাড়লে অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ আরও বাড়ে বলে তিনি দাবি করেন।

স্থানীয় যাত্রীদের অনেকেই মনে করছেন, রেলস্টেশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন কেন্দ্রে টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। দূর-দূরান্তে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ টিকিট না পেলে বাধ্য হয়ে বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করেন কিংবা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে টিকিট কিনতে বাধ্য হন।

সরেজমিনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, মহুয়া কমিউটার ট্রেনের টিকিট বিক্রিকে কেন্দ্র করে কাউন্টারের সামনে প্রায়ই উত্তেজনা ও ঝগড়াঝাটির পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তারা কাঙ্ক্ষিত টিকিট পান না। এতে নারী, বয়স্ক ও দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

অন্যদিকে, রেলওয়ের অনিয়ম ও কথিত টিকিট কালোবাজারি বন্ধের দাবিতে প্রশাসনের কাছেও লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন ‘জুলাইযোদ্ধা’ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেত্রকোনা জেলার সংগঠক ফারহান নিয়ান তানভীর আহমেদ।

আবেদনে অভিযোগ করা হয়, প্রতিদিন শত শত যাত্রী লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে কাউন্টার খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে গেছে বলে জানানো হয়। পরে সেই টিকিট দালালদের মাধ্যমে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

লিখিত আবেদনে বিষয়টি তদন্তের জন্য আইডি কার্ড যাচাইসহ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। টিকিট বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা, দায়িত্বশীলদের কার্যক্রম তদারকি করা এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো যাত্রী অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বা তথ্য সংগ্রহ করলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

তবে টিকিট সিন্ডিকেটে স্টেশন কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হয়। ফলে কাউন্টার থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টিকিট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় এবং তার কোনো কর্মী এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।

তিনি আরও বলেন, কেউ অনলাইনে বৈধভাবে টিকিট কিনে পরে বাইরে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করলে সেটি প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মহুয়া কমিউটার ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থাপনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাদের পক্ষ থেকে মূলত তদারকির দায়িত্ব পালন করা হয় বলেও জানান তিনি।

তবে যাত্রীদের প্রশ্ন, যদি কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকে, তাহলে বারবার একই ধরনের অভিযোগ কেন উঠছে এবং সাধারণ মানুষ কেন নিয়মিত ভোগান্তির কথা বলছেন। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। টিকিট বিক্রির সময় কারা কাউন্টারে প্রবেশ করছেন, কীভাবে টিকিট বিতরণ হচ্ছে এবং অভিযোগ পাওয়া টিকিটগুলো পরে কার মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার।

মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের সাম্প্রতিক এই ঘটনা তাই এখন শুধু একজন যাত্রীর ওপর হামলার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এটি গণপরিবহনে সাধারণ মানুষের অধিকার, টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং প্রতিবাদ করার নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সাধারণ যাত্রীরা আশা করছেন, মারধরের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারির অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যক্তি বা চক্র অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ যেন নির্ধারিত দামে নিরাপদভাবে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com