প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নাটোরে দিনভর পৃথক অভিযান চালিয়ে ফেনসিডিলজাতীয় মাদক, চোলাই মদ ও গাঁজাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নাটোর শহর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত এসব অভিযানে এক বৃদ্ধা নারীসহ চারজনকে আটক করা হয়। অভিযানে মোট ১৪০ বোতল ফেনসিডিলজাতীয় নতুন ধরনের মাদক, ১৫ লিটার চোলাই মদ এবং ২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই দিনে একাধিক অভিযান পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের অবৈধ ব্যবসা ও সরবরাহ বন্ধে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের উৎস এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রীফা রাওনাক নীতু জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাতে নাটোর শহরের স্টেশন বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ২ কেজি গাঁজাসহ মোসা. হেলেনা বেগম নামে ৬৫ বছর বয়সী এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হেলেনা বেগমের বাড়ি দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার দক্ষিণ বাসুদেবপুর গ্রামে। তিনি মৃত খোরশেদ আলমের স্ত্রী। অভিযানের পর তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক আসাদুর রহমান বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
একই দিনে বিকেলের দিকে নাটোর শহরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় আরও একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানে ১৫ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয় এবং দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন চকবৈদ্যনাথ গ্রামের শ্রী শ্যামল ভূঁইয়ার ছেলে শ্রী সুরুজ ভূঁইয়া এবং শ্রী বাবুল ভূঁইয়ার ছেলে শ্রী রঞ্জিত ভূঁইয়া। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও উপপরিদর্শক আসাদুর রহমান বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁদের জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এর আগে বুধবার সকালেই নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানের আরেকটি ঘটনা ঘটে। উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে ইয়াকুব কবিরাজ নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযানের সময় বাড়ির বিভিন্ন স্থান তল্লাশি করা হয়। একপর্যায়ে ইয়াকুব কবিরাজের শয়নকক্ষের বারান্দা এলাকায় মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় ফেনসিডিলজাতীয় বিভিন্ন নতুন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়।
সেখান থেকে মোট ১৪০ বোতল মাদক জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া এসব বোতল দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কি না এবং এগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযুক্ত ইয়াকুব কবিরাজ কালিকাপুর গ্রামের মৃত মোখলেছ কবিরাজের ছেলে। ঘটনাটির পর বুধবার রাতে বড়াইগ্রাম থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। মামলায় বাদী হয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সবুজ দেবনাথ।
একই দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথকভাবে পরিচালিত এসব অভিযানে মাদক উদ্ধারের ঘটনা নাটোরে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের গুরুত্বকে আবারও সামনে এনেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মাদক ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালালেও অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে মাদক সংরক্ষণের জন্য বাড়ির ভেতরে বা আশপাশের এলাকায় গোপন স্থান ব্যবহারের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। বড়াইগ্রামের অভিযানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় বিপুলসংখ্যক বোতল উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি মাদক লুকানোর এমন কৌশলের দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজের ওপরও। মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে মাদক সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।
নাটোরে পরিচালিত সর্বশেষ অভিযানে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শুধু গ্রেপ্তার ও মামলা করলেই মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন সচেতন মহল। মাদকের উৎস বন্ধ করা, সীমান্ত ও সরবরাহপথে নজরদারি বাড়ানো এবং তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান যেন নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা বড় চক্রগুলোকেও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। ছোট পর্যায়ের বিক্রেতা বা বাহকদের পাশাপাশি সরবরাহকারী ও অর্থদাতাদের চিহ্নিত করা গেলে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক দুর্বল করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
নাটোরে বুধবারের এই ধারাবাহিক অভিযান সেই মাদকবিরোধী প্রচেষ্টারই একটি অংশ। শহরের স্টেশন বাজার, চকবৈদ্যনাথ এবং বড়াইগ্রামের কালিকাপুরে পৃথক অভিযানে বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, জেলার একাধিক এলাকায় মাদকবিরোধী নজরদারি অব্যাহত রাখা জরুরি।
গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো এখন আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে। তদন্তে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের উৎস, সম্ভাব্য সরবরাহকারী এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। সন্দেহজনক মাদক কার্যক্রমের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নাটোরে এক দিনের অভিযানে বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নয়, সমাজের সামনে মাদকবিরোধী সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে তুলে ধরেছে।