প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৬ হাজার গ্রাহক ২৫০ কোটি টাকা ফেরত পেয়েছেন। একই সঙ্গে অনেক আমানতকারী টাকা তোলার সুযোগ পেয়েও তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ উত্তোলন না করে আমানত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আশ্বাস এবং মেয়াদি আমানতের মুনাফার বিষয়টি তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে জানা গেছে।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া অর্থ ফেরত কার্যক্রমের প্রথম দিনে বড় ধরনের কোনো জটিলতার খবর পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সঞ্চয় নিয়ে উদ্বেগে থাকা গ্রাহকদের একটি অংশ ব্যাংকে এসে অর্থ গ্রহণ করেছেন। আবার কেউ কেউ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আবেদন প্রত্যাহার করে আগের মতো আমানত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে সংকটে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার মাধ্যমে। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে নতুন এই ব্যাংক গঠন করা হয়। এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে নানা আর্থিক অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও তারল্য সংকটের কারণে চাপে ছিল। এর ফলে গ্রাহকদের মধ্যে নিজেদের আমানত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং অর্থ উত্তোলনেও নানা ধরনের ভোগান্তি দেখা দেয়।
ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের পর গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষা এবং অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে যাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজন, চিকিৎসা ব্যয়, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক জরুরি খরচের জন্য সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাঁদের কাছে অর্থ ফেরতের বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যবস্থায় অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাঁদের অনেকের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
এর আগে ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ ফেরতের আবেদন নেওয়া হয়। ওই সময়ে মোট ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের চাহিদা জানানো হয়। অর্থাৎ আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের আমানতের অর্থ ফেরত নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
আবেদনের প্রথম দিনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ফেরতের চাহিদা দেখা যায়। ওই দিন ১৮ হাজার ৪৬টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন জমা পড়ে। দ্বিতীয় দিনে ১৯ হাজার ৬১৩টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা, তৃতীয় দিনে ২১ হাজার ৮৬টি আবেদনের বিপরীতে ৯২৩ কোটি টাকা এবং শেষ দিনে ১৫ হাজার ৪৭৬টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৫৭ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করা হয়।
তবে আবেদন করা মানেই সবাই অর্থ তুলে নিচ্ছেন—প্রথম দিনের কার্যক্রমে এমন চিত্র পাওয়া যায়নি। বরং কিছু গ্রাহক অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য আবেদন করার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা জানতে পারেন, মেয়াদি আমানতের মূল টাকা এখন তুলে নিলে নির্ধারিত মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে তাঁদের আমানত নিরাপদ থাকার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হলে কেউ কেউ আবেদন প্রত্যাহার করে অর্থ ব্যাংকেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানিয়েছেন, আবেদন করা সব গ্রাহকের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে সবাই ব্যাংকে এসে টাকা নেননি। অনেক গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের আমানত চালু রাখার কথা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অর্থ তুলে নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুনরায় ব্যাংকে জমা করেছেন বলেও জানান তিনি।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আর্থিক প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কাজ করছে। কেউ জরুরি প্রয়োজনে অর্থ তুলেছেন, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় থেকে এখনই বের হতে চাননি। বিশেষ করে মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে মুনাফার বিষয়টি গ্রাহকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একজন গ্রাহক মশিউর রহমান অর্থ উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছিলেন। পরে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, এখন মেয়াদি আমানত ভেঙে পুরো টাকা তুলে নিলে মুনাফা পাওয়া যাবে না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমানত নিরাপদ থাকার বিষয়েও তাঁকে আশ্বস্ত করে। ফলে তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর মুনাফাসহ অর্থ উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক মোহাম্মদ শাহাদাতের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বাবার চিকিৎসার জন্য তাঁর জরুরি অর্থের প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে টাকা তুলতে না পারায় তিনি ভোগান্তিতে ছিলেন। অর্থ ফেরতের আবেদন করার পর প্রথম দিনেই টাকা হাতে পাওয়ায় তাঁর সেই আর্থিক চাপ কিছুটা কমেছে।
এদিকে এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায়ও গ্রাহকদের মধ্যে অর্থ উত্তোলনের আগ্রহ দেখা যায়। কেউ কেউ টাকা তুলেছেন, আবার মুনাফা পাওয়ার শর্ত নিয়ে কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আলোচনা ও বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, অর্থ ফেরতের পাশাপাশি মুনাফা ও আমানতের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থ ফেরতের পাশাপাশি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমেও ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর কার্যক্রম চালু হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের অচলাবস্থার পর ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ চালু হওয়াকে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ এবং মেয়াদি আমানতের মূল অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে মেয়াদি আমানতের পুরো মূল টাকা একবারে তুলে নিলে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আমানতের জন্য কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে যাঁরা এখনই অর্থ উত্তোলন না করে তাঁদের আমানত চালু রাখবেন, তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম আরও স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে মুনাফাসহ অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগও স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আমানত ফেরত দেওয়া নয়, বরং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন করা। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যুক্ত গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হলে নিয়মিত লেনদেনের পাশাপাশি গ্রাহকদের আমানত ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে মোট প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারী ছিলেন। তাঁদের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবেই রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বর্তমান অর্থ ফেরত কার্যক্রমের পরিধি যেমন বড়, তেমনি এর আর্থিক ও সামাজিক গুরুত্বও ব্যাপক।
প্রথম দিনে ৬ হাজারের মতো গ্রাহকের হাতে ২৫০ কোটি টাকা পৌঁছে যাওয়া অর্থ ফেরত প্রক্রিয়ার একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। সামনে আরও বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে যারা আমানত চালু রাখছেন, তাঁদের আস্থা ধরে রাখাও ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একজন আমানতকারীর কাছে ব্যাংকে রাখা অর্থ শুধু একটি হিসাবের সংখ্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটি বছরের পর বছর সঞ্চয় করা পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসার ভরসা কিংবা ব্যবসার মূলধন। তাই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর অর্থ হাতে পাওয়ার স্বস্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ মনে করে সেই অর্থ ব্যাংকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তও ব্যাংকটির প্রতি আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রথম দিনের কার্যক্রম তাই একদিকে যেমন অর্থ ফেরতের সূচনা করেছে, অন্যদিকে তেমনি গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের পরীক্ষাও শুরু করেছে। আগামী দিনগুলোতে অর্থ ফেরত কার্যক্রম কতটা নির্বিঘ্নে এগোয়, অনলাইন লেনদেন কতটা স্বাভাবিক হয় এবং আমানতকারীদের আস্থা কতটা ফিরে আসে—এসব বিষয়ের ওপরই নতুন ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের বড় একটি অংশ নির্ভর করবে।