ভারতের কোচ হওয়া নিয়ে নেহরার মজার শর্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ভারতের কোচ হওয়া নিয়ে নেহরার মজার শর্ত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ হওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন সাবেক পেসার ও গুজরাট টাইটান্সের প্রধান কোচ আশিষ নেহরা। জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে তাঁর এখনই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে এমন সুযোগ এলে পুরোপুরি দরজা বন্ধও রাখছেন না। বরং তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি করতে হবে পরিবারের সঙ্গে—বিশেষ করে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে।

কলকাতায় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (সিএবি) বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ভারতের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন নেহরা। সেখানেই নিজের স্বভাবসুলভ রসিকতার মাধ্যমে জানান, ভারতের কোচ হলে বছরে আট থেকে নয় মাস ভ্রমণ করতে হতে পারে। এত দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার বিষয়টি সহজ নয় বলেই মন্তব্য করেন তিনি।

একপর্যায়ে নেহরা বলেন, এমন প্রস্তাব এলে তাঁকে আগে তাঁর ‘হাই কমিশনের’ সঙ্গে কথা বলতে হবে—যার মাধ্যমে তিনি নিজের স্ত্রীকে বোঝান। এরপরই মজা করে বলেন, তা না হলে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য দ্রুতই ক্রিকেটাঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে নেহরার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘ ভ্রমণ, চাপ ও পারিবারিক জীবনের ওপর এর প্রভাব।

ভারতের বর্তমান প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের সময় নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। দলের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কোচের ভবিষ্যৎ নিয়েও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা সম্ভাবনা সামনে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পরবর্তী কোচ হিসেবে কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটারের নাম আলোচনায় এসেছে। তাঁদের মধ্যে ভিভিএস লক্ষ্মণের পাশাপাশি আশিষ নেহরার নামও রয়েছে।

তবে নেহরা নিজে বিষয়টিকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করতে চান না। জাতীয় দলের কোচ হওয়া নিঃসন্দেহে বড় সম্মানের বিষয় হবে, কিন্তু তিনি ক্যারিয়ারের পরিকল্পনায় এটিকে কখনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে রাখেননি। বর্তমানে গুজরাট টাইটান্সের সঙ্গে তিনি সুখেই আছেন বলেও জানিয়েছেন।

নেহরার এই অবস্থানের পেছনে শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোচিংয়ের কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। একটি জাতীয় দলের প্রধান কোচকে সারা বছর বিভিন্ন সিরিজ, টুর্নামেন্ট ও প্রস্তুতি ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। দেশের বাইরে দীর্ঘ সফর, একের পর এক ম্যাচ, খেলোয়াড়দের ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যমের চাপ এবং ফলাফলের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে দায়িত্বটি অত্যন্ত demanding।

নেহরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই ধরনের চাপ দীর্ঘ সময় ধরে সামলানো সহজ নয়। তাঁর মতে, অনেক কোচই তিন-চার বছরের বেশি এমন দায়িত্বে থাকতে পারেন না। দীর্ঘ ভ্রমণ ও দায়িত্বের চাপের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারের সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানেই গুজরাট টাইটান্সের দায়িত্বের সঙ্গে ভারতের জাতীয় দলের দায়িত্বের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে কাজ করলেও মৌসুমের বাইরে কোচদের ব্যক্তিগত সময় ও অন্যান্য পেশাগত কাজের সুযোগ থাকে। কিন্তু জাতীয় দলের কোচের ক্ষেত্রে প্রায় পুরো বছরই ক্রিকেট সূচির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।

নেহরার কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি গুজরাট টাইটান্সকে ঘিরে। ২০২২ সালে আইপিএলে অভিষেক হওয়া গুজরাট টাইটান্সকে প্রথম মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। নতুন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে প্রথমবারের মতো আইপিএলের শিরোপা এনে দেওয়া নেহরার কোচিং দক্ষতার বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরের মৌসুমেও গুজরাট শিরোপার লড়াইয়ে ছিল। ২০২৩ সালে দলটি ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হয়। ২০২৬ মৌসুমেও নেহরার অধীনে গুজরাট টাইটান্স ফাইনালে জায়গা করে নেয়। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে দলটি একবার চ্যাম্পিয়ন এবং দুবার রানার্সআপ হয়েছে। এই ধারাবাহিক সাফল্যই নেহরাকে ভারতের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কোচদের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে নেহরা নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে রাজি নন। গুজরাট টাইটান্সের সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বরাবরই দলীয় প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু কোচের কারণে কোনো দল সফল হয় না। অধিনায়ক, খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফ এবং পুরো ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি দলকে সাফল্য এনে দেয়।

গুজরাট টাইটান্সের ক্ষেত্রে হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষভাবে সফল ছিল। ২০২২ সালে প্রথম মৌসুমেই কোচ নেহরা ও অধিনায়ক পান্ডিয়ার নেতৃত্বে দলটি শিরোপা জেতে। পান্ডিয়া পরবর্তীতে গুজরাট ছেড়ে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসে ফিরে যান এবং শুবমান গিল গুজরাটের নেতৃত্ব নেন।

গিলের নেতৃত্ব নিয়েও সম্প্রতি কথা বলেছেন নেহরা। তাঁর মতে, গিল এখনো অধিনায়ক হিসেবে শেখার পর্যায়ে রয়েছেন এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নেতৃত্ব আরও পরিণত হবে। পান্ডিয়া ও গিলের নেতৃত্বের ধরনকে তিনি একেবারেই ভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন। তবে দুজনের মধ্যেই শেখার আগ্রহ রয়েছে বলে মনে করেন গুজরাটের কোচ।

নেহরার নিজের কোচিং দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিগত কৃতিত্বের বদলে দলীয় সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া। এ কারণেই ভারতের জাতীয় দলের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা সামনে আনেননি। তাঁর বক্তব্যে বরং দায়িত্বটির বাস্তব চাপ এবং পারিবারিক জীবনের ভারসাম্যের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতীয় দলের কোচ হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারকে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি ক্রিকেটে নতুন নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি অনেক সময় কোচ ও খেলোয়াড় উভয়ের ব্যক্তিগত জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সফর, বিভিন্ন দেশে অবস্থান এবং বছরের বড় একটি সময় বাড়ির বাইরে কাটানোর কারণে পরিবারকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নেহরার বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই কিছুটা হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।

তবে নেহরা ভারতের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেননি। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় তা তখন দেখা যাবে। অর্থাৎ এখনই জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নেহরা একই সঙ্গে তাঁর বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—দুই দিকই খোলা রেখেছেন। তিনি বর্তমানে গুজরাট টাইটান্সের দায়িত্বে সন্তুষ্ট। দলটির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যও রয়েছে। ফলে জাতীয় দলের দায়িত্বের চেয়ে আপাতত ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেই তাঁর মনোযোগ বেশি।

নেহরার মন্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোচিং পেশার মানবিক বাস্তবতা। ক্রিকেটে জাতীয় দলের কোচকে সাধারণত ফলাফল দিয়ে বিচার করা হয়। জয় এলে প্রশংসা, পরাজয় এলে সমালোচনা—এই চক্রের মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অবিরাম ভ্রমণ ও খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের চাপ। ফলে একটি বড় দলের কোচ হওয়ার সুযোগ যেমন সম্মানের, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বড় ত্যাগও দাবি করে।

আশিষ নেহরার রসিক মন্তব্য তাই শুধু হাসির খোরাক নয়; এর ভেতরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোচিং পেশার কঠিন বাস্তবতাও উঠে এসেছে। ভারতের মতো ক্রিকেটপাগল দেশে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়া নিঃসন্দেহে বড় সম্মানের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘ সফর, প্রত্যাশা ও চাপ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই মুহূর্তে ভারতের কোচ হওয়ার দৌড়ে নেহরার নাম থাকলেও তাঁর নিজের বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি এই পদ পাওয়ার জন্য মরিয়া নন। বরং সময়, পরিস্থিতি এবং পরিবারের মতামত—সবকিছু বিবেচনা করেই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নিতে চান তিনি। আর সেই কারণেই ‘আগে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে’—নেহরার এই রসিক মন্তব্যটি ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে যেমন মজার, তেমনি একজন কোচের ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতাও তুলে ধরেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত