ইতালিতে হেনস্তার শিকার বাঁধন, বললেন ‘দমানো সহজ নয়’

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
ইতালিতে হেনস্তার শিকার বাঁধন, বললেন ‘দমানো সহজ নয়’

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতালির মেস্ত্রে শহরে হামলা ও হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তাঁর দাবি, স্থানীয় একটি পার্কে ভাই ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবস্থানের সময় একদল বাঙালি তাঁর ওপর চড়াও হয়। এ সময় তাঁকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারা হয়, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তাঁর হাতে থাকা মুঠোফোন ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় তাঁর ভাইয়ের শিশুসন্তানও সেখানে উপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বাঁধন বিস্তারিত বর্ণনা দেন। পরে তিনি ঘটনার কয়েকটি ভিডিওও প্রকাশ করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে, ধস্তাধস্তি করতে এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তবে ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সব দিক স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সোমবার রাতে ঘটে। তিনি বর্তমানে ইতালির মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন। ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় একটি পার্কে যাওয়ার পর সেখানে কয়েকজন বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয়।

ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, তিনি পরিবারের সঙ্গে পার্কে গিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে শারীরিকভাবে হেনস্তামূলক আচরণ করেন। তাঁর শরীরে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে তাঁর পোশাক ভিজে যায়। তাঁর দাবি, শুধু মৌখিক আক্রমণ নয়, একপর্যায়ে তাঁর শরীরেও হাত তোলা হয়।

অভিনেত্রী আরও জানান, তাঁর ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং কানের পাশেও আঘাত করা হয়েছে। তাঁর ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুরো ঘটনার মধ্যে পরিবারের একটি শিশুও উপস্থিত থাকায় পরিস্থিতিটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে বলে জানান বাঁধন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শিশুটির প্রসঙ্গ তুলে পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করতে শোনা যায়। ভিডিওতে এক ব্যক্তির কাছ থেকে শিশুটিকে নিয়েও উত্তেজিত মন্তব্য শোনা যায়। এসব দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বাঁধনের অভিযোগ, তাঁর ওপর হামলার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ কাজ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্দোলনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে রয়েছে। তবে হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনগত সম্পৃক্ততার দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বাঁধন আরও অভিযোগ করেন, তাঁকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বলা হয়। এ সময় তাঁর বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উত্তেজিত মন্তব্য এবং তাঁকে ‘জুলাই জঙ্গি’ হিসেবে অভিহিত করতে শোনা যায়।

ঘটনার পর বাঁধনের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে তাঁর দৃঢ় প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো সহজ হবে না। তাঁর মতে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রীকে এভাবে হেনস্তার ঘটনা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাঁধন আরও বলেন, হামলাকারীদের এমন আচরণ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বিদেশের মাটিতে সংঘাতের সংস্কৃতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ ঘটনার বিষয়ে তিনি স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন।

ঘটনার সময় বাঁধনের সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে শিশুটির উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে পরিবারের সদস্যদের সামনে কাউকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতালিতে যাওয়ার মূল কারণ অবশ্য রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি নয়। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে দেশটিতে গেছেন বাঁধন। সিনেমাটি উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক অরিজন্তি বিভাগে জায়গা পেয়েছে।

৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনা থিয়েটারে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। চলচ্চিত্রটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল ও আজমেরী হক বাঁধন। সিনেমাটির প্রদর্শনীকে ঘিরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এমন একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার সময় বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিযোগের ঘটনা তাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাঁধন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ। অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে তিনি আলোচনায় থেকেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়ও তাঁকে রাজপথে দেখা যায় এবং আন্দোলনের পক্ষে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কথা বলতে দেখা যায়।

সেই সময় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে যেমন সমর্থন তৈরি হয়েছিল, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধিতাও দেখা যায়। ইতালির ঘটনার বিষয়ে বাঁধনের অভিযোগের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে বলেই তিনি মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থান করেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ভিডিও বার্তায় বাঁধন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি দাবি করেন, জয়ও ভেনিসে অবস্থান করছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর কাছে ঘটনার বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলেন অভিনেত্রী। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটিকে ঘিরে এখন কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হামলায় কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের প্রকৃত পরিচয় কী, ঘটনাটি ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং ইতালির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা। বাঁধন থানায় অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন। ফলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সামনে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

একজন শিল্পী বিদেশের মাটিতে ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক মত প্রকাশের কারণে হামলার শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বদলে আইনগত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করাও জরুরি। কারণ একটি ভিডিওতে ঘটনার একটি অংশ দৃশ্যমান হলেও তার আগে বা পরে কী ঘটেছিল, সেটি সবসময় পুরোপুরি বোঝা যায় না।

তবে বাঁধনের প্রকাশ্য অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঘটনার পর তিনি নিজেকে ভীত বা নীরব করে রাখার বদলে বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন, এ ধরনের আচরণ তাঁকে দমিয়ে দিতে পারবে না। তাঁর অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার দায় কার ওপর বর্তায়, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও ইতালিতে একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীর সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মতো আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা ও শিল্পীদের অংশগ্রহণ যেখানে দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে, সেখানে সেই পরিসরে কোনো বাংলাদেশি শিল্পীকে ঘিরে সংঘাত বা হেনস্তার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদকে ব্যক্তিগত হামলা বা হেনস্তায় রূপ না দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত