সৌদির আরামকোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হুতিদের হামলার দাবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
সৌদির আরামকোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হুতিদের হামলার দাবি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী। মঙ্গলবার হুতিদের গণমাধ্যম আনসারুল্লাহর একাধিক বার্তায় বলা হয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর কয়েকটি স্থাপনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে হুতিদের দেওয়া এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও হামলার ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হামলার প্রকৃত মাত্রা, ক্ষয়ক্ষতি এবং সবগুলো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা সফল হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আনসারুল্লাহর টেলিগ্রাম পোস্টে বলা হয়েছে, ইয়েমেন থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। পৃথক আরেকটি বার্তায় আবহা বিমানবন্দর, কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং আবহা ও জিজান এলাকায় আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনার নাম উল্লেখ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। বিশেষ করে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী জিজান এলাকায় আরামকোর স্থাপনাকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ওই এলাকায় তেল অবকাঠামোতে হামলার খবর সামনে এলেও সেসব হামলার তাৎক্ষণিক দায় কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। এবার হুতিদের গণমাধ্যমের মাধ্যমে হামলার দায় স্বীকারের দাবি সামনে এসেছে।

সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত জিজান ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বন্দরনগরী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব অতীতেও এই অঞ্চলে পড়েছে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় জিজান ও আশপাশের এলাকার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাগুলো এর আগেও বিভিন্ন হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এসব স্থাপনার ওপর হামলা শুধু স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থার ওপরও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলার পটভূমিতে ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব এবং হুতিদের বিরুদ্ধে গঠিত আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাতে ইয়েমেনের অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি ভূখণ্ডও হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে।

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির পর সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বড় ধরনের সরাসরি সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে অবরোধের ঘোষণা আসে। এর পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হওয়ায় দেশটির বড় কোনো উৎপাদন বা সরবরাহকেন্দ্রে হামলা হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক এলাকায় একই সময়ে সামরিক উত্তেজনা চলতে থাকলে তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি এই কারণেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তেল উৎপাদন, পরিশোধন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে শুধু একটি স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না; বরং এর প্রভাব সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যান্য অংশেও পড়তে পারে। তবে এবারের কথিত হামলায় আরামকোর উৎপাদন বা রপ্তানি কার্যক্রমে বাস্তবে কতটা প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কিং খালিদ বিমানঘাঁটির নাম হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছে হুতিদের গণমাধ্যম। বিমানবন্দর বা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি সত্য হলে তা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে হামলার ফলে বিমান চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্যও এখনো সীমিত।

হুতিদের পক্ষ থেকে হামলার দাবি এমন সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একাধিক কারণে অস্থিতিশীল। গাজা ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের সামরিক তৎপরতা পুরো অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

হামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সীমান্তবর্তী ও শিল্পাঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের ওপর। সামরিক স্থাপনা কিংবা জ্বালানি অবকাঠামোর আশপাশে হামলা হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড বা অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কার পাশাপাশি আতঙ্কের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে মানুষের চলাচলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইয়েমেনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সংঘাত সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক মানবিক চাপ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে দেশটির বহু মানুষকে। নতুন করে সৌদি-হুতি সংঘাত তীব্র হলে সেই মানবিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে অতীতের সংঘাত দেখিয়েছে, সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুত সীমান্তের বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে। একটি পক্ষের হামলার পর অন্য পক্ষ পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিলে উত্তেজনার মাত্রা বাড়তে পারে। এতে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ মুহূর্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হামলার প্রকৃত মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং নতুন করে সংঘাত বিস্তার রোধ করা। বেসামরিক স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা যাতে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।

হুতিদের হামলার দাবি যদি পরবর্তী সময়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়, তাহলে তা সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে কয়েক বছর ধরে চলা তুলনামূলক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হামলার দাবি, লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আরও তথ্যের অপেক্ষা করা জরুরি। কারণ সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রচারিত তথ্য অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হতে পারে। তাই হতাহত, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং জ্বালানি উৎপাদনে প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার নতুন উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর। দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো নতুন করে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো এবং বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত