ইসরাইলি হামলায় লেবাননে নিহত প্রায় ৮০০ শিশু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
ইসরাইলি হামলায় লেবাননে নিহত প্রায় ৮০০ শিশু

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লেবাননে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইসরাইলি সামরিক হামলায় শিশুদের ওপর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের দুই দফা সংঘাতে প্রায় ৮০০ শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হামলায় আহত বহু শিশুকে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক হামলাগুলোতেও। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় চালানো কয়েকটি হামলায় দুই শিশু নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নাবাতিয়েহ জেলার কাফর রুম্মান শহরে একটি বাড়িতে বিমান হামলায় দুই শিশু নিহত হওয়ার পাশাপাশি চারজন আহত হয়েছে। আরবসালিম ও নাবাতিয়েহ শহরেও হামলায় আরও তিন শিশু আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, হামলা বন্ধের চুক্তি ও কাঠামোগত সমঝোতা বারবার লঙ্ঘনের কারণে পরিস্থিতি এখন আরও গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। হামলা বন্ধ এবং চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

লেবাননে চলমান সংঘাতের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা শুধু নিহত ও আহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। ঘরবাড়ি হারানো, পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসাসেবার সংকট এবং ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা তাদের স্বাভাবিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

লেবাননের পার্লামেন্টের নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির প্রধান ইনায়া এজেদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের দুই দফা ইসরাইলি সামরিক অভিযানে প্রায় ৮০০ শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে বিপুলসংখ্যক শিশু। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গুরুতরভাবে আহত হয়ে একাধিকবার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়েছে। কিছু শিশু হাত-পা কিংবা চোখ হারিয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এজেদ্দিনের মতে, এসব শিশুর অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগীয় স্থিতিশীলতা এবং সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বিশেষ সহায়তাও প্রয়োজন। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষতির বাইরে শিশুদের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তার প্রভাব অনেক সময় দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বাস্তুচ্যুতির চিত্রও উদ্বেগজনক। পার্লামেন্টের নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দুই দফা সংঘাতে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সব মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখে পৌঁছেছে বলে লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বাস্তুচ্যুত শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন আশ্রয়ের স্থানও নিরাপদ থাকে না। এজেদ্দিন জানিয়েছেন, হামলা থেকে বাঁচতে যেসব এলাকায় পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছিল, সেসব জায়গার কিছু অংশেও পরবর্তী সময়ে হামলা হয়েছে। ফলে অনেক শিশুকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। বারবার ঘরবাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ হারানোর কারণে তাদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ আরও বাড়ছে।

যুদ্ধের সময় পরিবারের সদস্যদের হারানোর অভিজ্ঞতাও শিশুদের জন্য গভীর আঘাত তৈরি করছে। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় কিংবা নিজেদের বাড়ি ছাড়ার পরিস্থিতিতে কিছু শিশু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হামলার শিকার হয়েছে। ফলে অনেক শিশুর কাছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়; বরং তা তাদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিস্তারিত পরিসংখ্যানেও হতাহতের ব্যাপকতা উঠে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৫৯ জন শিশু। একই সময়ে আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৩৭৮ জন, যার মধ্যে শিশু ১ হাজার ৫০ জন।

হতাহতের পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোর ক্ষতির ফলে শিশুদের নিয়মিত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেবাননে শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও যুদ্ধজনিত মানসিক আঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও শিশুদের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে ইউনিসেফ। সংঘাতের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের প্রতি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও হামলা অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু এলাকা দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আবার কিছু এলাকা সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় দখলে নেওয়া হয়েছে বলে লেবাননের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতায় ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ডের ১০ কিলোমিটারের বেশি ভেতরে অগ্রসর হয়েছে বলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য রয়েছে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের নিরাপত্তা ও প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

লেবাননের পরিস্থিতি তাই কেবল সামরিক সংঘাতের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা, বাস্তুচ্যুত পরিবারের সংখ্যা এবং বিশেষ করে শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও এর মানসিক ও সামাজিক ক্ষত কত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞ ও শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, সংঘাত থামার পরও শিশুদের জন্য সংকট শেষ হবে না। আহত শিশুদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ফিরিয়ে দেওয়া এবং যুদ্ধজনিত মানসিক আঘাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং শিশুদের স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেবাননে প্রায় ৮০০ শিশুর মৃত্যুর যে তথ্য সামনে এসেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মানবিক মূল্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবের বাইরে এসব শিশুর মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুতি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় প্রশ্ন। সংঘাতের অবসান, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত