রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার প্রথম সড়ক সেতু চালু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার প্রথম সড়ক সেতু চালু

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথম সরাসরি সড়ক সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তের তুমেন নদীর ওপর নির্মিত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে রেল ও আকাশপথে যুক্ত থাকলেও এতদিন দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

সোমবার স্থানীয় সময় সেতুটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন এবং উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থায়ে সং ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে অংশ নেন। উদ্বোধনের পর দুই দেশের পতাকা সজ্জিত ট্রাক নতুন সেতু দিয়ে চলাচল শুরু করে। রুশ কর্মকর্তারা এটিকে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তুমেন নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি দুই লেনের এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। রুশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সড়কপথ দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন চলাচল করতে পারবে। শুরুতে মূলত পণ্যবাহী যান চলাচলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ যাত্রীবাহী যান চলাচলের জন্যও সেতুটি পুরোপুরি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, সীমান্তবর্তী পরিবহন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাশিয়ার ভাষ্য, নতুন সেতুর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পর্যটনও বাড়তে পারে।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সেতুটিকে দুই দেশের বহুমুখী সহযোগিতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষ ও পণ্য পরিবহন, পর্যটন এবং দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিনিময় বাড়াতে সহায়ক হবে।

নতুন সেতুটির গুরুত্ব অবশ্য শুধু বাণিজ্যিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। ২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় দুই দেশ একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে পৌঁছায়। একই সময় নতুন সড়ক সেতু নির্মাণের বিষয়েও চুক্তি হয়।

সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণের পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো। সেতুটি রাশিয়ার খাসান এলাকা ও উত্তর কোরিয়ার রা‌সন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে সীমান্ত অতিক্রম করে পণ্যবাহী যান চলাচলের জন্য একটি নতুন ও অপেক্ষাকৃত সরাসরি পথ তৈরি হয়েছে।

এতদিন দুই দেশের স্থল যোগাযোগ মূলত একটি পুরোনো রেলসেতুর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ওই সেতু দিয়ে রেল চলাচল হলেও সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। নতুন সেতুর ফলে এই সীমাবদ্ধতা দূর হলো। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের সীমান্ত অবকাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সেতুটির নামকরণও দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। এর নাম রাখা হয়েছে সোভিয়েত সেনা কর্মকর্তা ইয়াকভ নোভিচেঙ্কোর নামে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল সুংকে একটি হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য নোভিচেঙ্কো উত্তর কোরিয়ায় বিশেষভাবে স্মরণীয়। ফলে সেতুটির নামও দুই দেশের রাজনৈতিক বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগও রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়েছে বলে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়েও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সড়কসেতুটিকে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ সামরিক ও সরবরাহ ব্যবস্থার সম্ভাব্য নতুন রুট হিসেবে দেখছেন। ইউক্রেনীয় সংস্থা ট্রুথ হাউন্ডসের মতো কিছু পর্যবেক্ষক দাবি করেছে, সেতুটি ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সদস্য, শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের রাশিয়ায় পাঠানো এবং বিপরীত দিকে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই সেতুটির সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি বর্তমানে সম্ভাবনা ও বিশ্লেষণের পর্যায়েই রয়েছে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ও পর্যটন সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া রুশ পর্যটকদের জন্য প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর পর দুই দেশের পর্যটন যোগাযোগে কিছুটা গতি এসেছে। উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, বিশেষ করে পিয়ংইয়ং ও ওনসান-কালমা এলাকার প্রতি রুশ পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন সড়ক যোগাযোগ এ ধরনের যাতায়াত আরও সহজ করতে পারে বলে মস্কো ও পিয়ংইয়ং আশা করছে।

সেতুটি দুই দেশের শ্রমবাজারের যোগাযোগেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের রাশিয়ায় কাজ করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার কাঠামোর মধ্যেও উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের বিদেশে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। নতুন স্থলপথ চালু হওয়ায় এই ধরনের যাতায়াত নিয়ে ভবিষ্যতে আরও নজরদারি তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে তুমেন নদীর ওপর নতুন সড়কসেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বাস্তব প্রতিফলন। মস্কো যেখানে এটিকে বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ এর কৌশলগত গুরুত্বের দিকটিও সামনে আনছে।

সেতুটি এখন থেকে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের নতুন পথ হিসেবে কার্যকর হবে। যাত্রী চলাচলও পুরোপুরি চালু হলে এর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তবে আগামী দিনে এই অবকাঠামো মূলত বাণিজ্য ও জনসংযোগ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হবে, নাকি রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে—সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত