প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে উচ্চ পর্যায়ের একটি জ্বালানি সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অনুসন্ধানের ঘাটতির কারণে সংকট গভীর হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
সোমবার সংসদের বৈঠকে জ্বালানি সংকট উত্তরণ নিয়ে সাধারণ আলোচনায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা হয়। এতে সরকার ও বিরোধী দলের পাঁচজন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
আলোচনার শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার মতে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে আছে।
শফিকুর রহমান বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বিরোধী দল। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি কার্যকর জ্বালানি সেল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। সরকার চাইলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কারিগরি বিশেষজ্ঞদেরও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানান তিনি।
তবে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার অভিযোগ, মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ না নেওয়ার কথা বলা হলেও তা এখনো আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কথিত ‘ভূতুড়ে বিল’ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, জ্বালানি খাতের সমস্যার সমাধানে বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংসদে অতীত সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও আলোচনায় আনেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আগের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বা ‘দুষ্টচক্র’ আবারও তৈরি হতে পারে। সরকারি অর্থ ব্যয় এবং পারিবারিক বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাতের বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার মতে, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভবিষ্যতের অনেক সংকট আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার দাবি, গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকছেন। লংমার্চের সময় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান পরিস্থিতির তুলনায় আগামী বছর কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। ২০২৮ সালের মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিরোধী দলের উত্থাপিত প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানান তিনি।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি বলেন, অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড শুরু হয়েছে, যার সময়সীমা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। পাশাপাশি দেশে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ চলমান রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
এই ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণের কথাও জানানো হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর অন্তত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি করার উদ্যোগ রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দ্রুত চালু করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংসদে জানানো হয়। সরকারের পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ছয় মাসে রুফটপ সোলার স্থাপনে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫৫ পয়সা দরে কেনার সুযোগ রাখছে বলেও জানানো হয়।
মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং উইন্ডমিল স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও অতীতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের কাঠামো সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি বলে তিনি দাবি করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংকট শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করে সমাধান করা হবে না। বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং নতুন অনুসন্ধানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, বর্তমান ভোগান্তি বর্তমান সরকারের তৈরি নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে চুক্তিটি বাতিলের দাবি উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব নয়। চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই চুক্তি বন্ধ হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিও অতীতের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আগের সময়ে জ্বালানি নীতির সুবিধা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছালেও দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়নি। বর্তমান সরকারের সামনে তাই একদিকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা এবং অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মূল সমস্যা শুধু জ্বালানির ঘাটতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও। তিনি মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে আপত্তি জানান এবং এগুলো বন্ধের দাবি করেন।
সংসদের আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মূল্য নির্ধারণ, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান সংকটের দায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মূলত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। শিল্পকারখানায় উৎপাদন সচল রাখা, কর্মসংস্থান ধরে রাখা, ব্যবসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফেরাতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই আগামী দিনের পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।