সম্প্রীতি বিনষ্টের অপতৎপরতা চলছে: রিজভী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
সম্প্রীতি বিনষ্টের অপতৎপরতা চলছে: রিজভী

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান অটুট রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি বলেছেন, নানা ধরনের অপশক্তি ও চক্রান্তকারীরা দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসব অপতৎপরতা বাংলাদেশের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে নষ্ট করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রুহুল কবীর রিজভী।

রিজভীর বক্তব্যে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন এবং একে অপরের ধর্মীয় উৎসব ও পার্বণে অংশ নেন। পারস্পরিক এই অংশগ্রহণ ও সামাজিক বন্ধন বাংলাদেশের সমাজজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্য বহু বছরের। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেন। একই এলাকায় বসবাস, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক নানা আয়োজনে পারস্পরিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা থাকলেও সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কের জায়গায় সেই পার্থক্য অনেক সময় গৌণ হয়ে আসে।

রিজভী এই সামাজিক বন্ধনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট করার অপতৎপরতা থাকলেও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এই বন্ধন যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ একে অপরের পূজা-পার্বণে অংশগ্রহণ করে এবং এই পারস্পরিক অংশগ্রহণই সামাজিক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

তিনি আরও জানান, তিন ধর্মের জন্য তিনটি ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব ট্রাস্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলো আরও সমৃদ্ধ করা এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা সুন্দরভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ট্রাস্টগুলোর কার্যক্রম বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

উপাসনালয় পরিচালনা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হলে সেখানে নিয়মিত ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগও শক্তিশালী হয়। এ কারণে ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সব সম্প্রদায়ের সমান স্বার্থ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ট্রাস্টের কার্যক্রম যদি নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সামগ্রিক প্রয়োজন বিবেচনায় পরিচালিত হয়, তাহলে তার সুফল দীর্ঘমেয়াদে আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে এসব উদ্যোগের প্রতি আস্থাও বাড়তে পারে।

রিজভী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের ধারণা অনুযায়ী দেশের সব মানুষ একই ছায়াতলে অবস্থান করেন। তাঁর প্রত্যাশা, গঠিত ট্রাস্টগুলো প্রত্যেক সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি নাগরিক পরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ, গুজব, উসকানি কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও দায়িত্বশীল ভূমিকা জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে কোনো গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্য অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি যাচাইহীন তথ্য কখনো কখনো স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রিজভীর বক্তব্যও এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। তিনি যেসব অপশক্তি ও চক্রান্তকারীর কথা বলেছেন, তাদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে রাজনৈতিক সতর্কবার্তা ও সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

একটি বহুধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একই পাড়ার মানুষ একে অপরের আনন্দ-বেদনায় পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং সামাজিক নানা আয়োজনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক তৈরি করেন, সেটিই অনেক সময় বড় কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন জায়গায় এমন পারস্পরিক সম্পর্কের বহু উদাহরণ রয়েছে। কোথাও ঈদের সময় প্রতিবেশীরা একে অপরের বাড়িতে যান, কোথাও পূজার সময় স্থানীয় অন্য ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করেন। আবার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মানুষকে একসঙ্গে দেখা যায়। এই সম্পর্কগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিনের সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে এগুলো গড়ে উঠেছে।

রিজভীর বক্তব্যে সেই সামাজিক বন্ধন রক্ষার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, ষড়যন্ত্র বা অপতৎপরতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা হলেও মানুষের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ঐতিহ্য টিকে থাকবে।

তবে সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দল বা সরকারের নয়। ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড এড়িয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।

বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক মতপার্থক্যের মধ্যেও ধর্মীয় পরিচয়কে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রভাব কোনো একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ অবস্থায় তিন ধর্মের জন্য গঠিত ট্রাস্টগুলোর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে এবং উপাসনালয়গুলোর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—তা ভবিষ্যতে স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়াতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রুহুল কবীর রিজভীর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষকে একই সামাজিক ও জাতীয় বন্ধনে আবদ্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা। তাঁর ভাষায়, দেশের সবাই জাতীয়তাবাদের একই ছায়াতলে অবস্থান করেন। সেই ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থা ধরে রাখতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় সম্প্রীতির যে বাস্তব চর্চা রয়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। সেই ভিত্তি শক্তিশালী রাখতে গুজব, বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই যে বেশি প্রয়োজন—রিজভীর বক্তব্যে সেই বার্তাই উঠে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত