হিমাগারে আলু রেখে বড় লোকসানে চাষিরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
হিমাগারে আলু রেখে বড় লোকসানে চাষিরা

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গত মৌসুমে ভালো দামের আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন জয়পুরহাট ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বহু কৃষক। মৌসুমের শুরুতে বাজারদর বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় মাঠ থেকে আলু তুলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি না করে হিমাগারে রাখেন তারা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে বাজারে আলুর দাম কমতে থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তায়। উৎপাদন, পরিবহন, বাছাই ও হিমাগার ভাড়াসহ নানা খরচ যোগ করে যে দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে, বর্তমান বাজারদর তার চেয়ে অনেক কম। ফলে বস্তাপ্রতি শত শত টাকা লোকসান গুনছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের কৃষক মকবুল হোসেন গত মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ভালো দাম পাওয়ার আশায় তিনি জমি থেকে তোলার পর আলুগুলো বিক্রি না করে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। তার ধারণা ছিল, মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে সরবরাহ কমলে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু সেই হিসাব মেলেনি। বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু তুলে বাজারে বিক্রি করলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি বস্তায় বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে।

হিমাগার গেটে দাঁড়িয়ে মকবুল হোসেনের মতো অনেক কৃষককে এখন হিসাব কষতে দেখা যাচ্ছে। কেউ লোকসান দিয়ে আলু বিক্রি করছেন, কেউ আবার আরও কিছুদিন দাম বাড়ার আশায় অপেক্ষা করছেন। কিন্তু অপেক্ষা করলেও হিমাগারের ভাড়া বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন মৌসুমের চাষাবাদের খরচ সামনে চলে আসছে। ফলে অনেক কৃষকের হাতে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়েছে।

সড়াইল গ্রামের কৃষক মোকলেছুর রহমানও বেশি দামের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। এখন সেই আলু বিক্রি করতে গিয়ে হিমাগার ভাড়াসহ অন্যান্য খরচের হিসাব মিলিয়ে হতাশ তিনি। তার মতে, মৌসুমের সময় আলু বিক্রি করে দিলে অন্তত হিমাগার ভাড়ার বাড়তি বোঝা থাকত না। এখন বাজারদর কম থাকায় একদিকে আলু থেকে প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে সংরক্ষণের খরচও বহন করতে হচ্ছে।

জয়পুরহাটের কৃষকদের এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বেশি হওয়াকে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২২টি হিমাগারে এবার প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে আলুর দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উঠছে না। হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে থাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

কৃষকদের আশঙ্কা, হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজারে ছাড়তে হলে একসঙ্গে সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে। এতে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন মৌসুমের আগাম আলু বাজারে আসতে শুরু করলে পুরোনো আলুর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তখন হিমাগারে থাকা আলুর বাজারদর আরও নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আলু ব্যবসায়ীরাও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে নেই। জয়পুরহাটের ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান জানান, বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করে বস্তাপ্রতি গড়ে প্রায় ৪০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। এর মধ্যে ঋণের চাপ রয়েছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য নেওয়া ঋণ নবায়ন করতে না পারায় মূলধন সংকটও তৈরি হয়েছে। তার মতে, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমাতে দ্রুত রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। এতে বড় ধরনের লাভ না হলেও অন্তত মূলধনের একটি অংশ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজু আলম সরকার জানান, গত মৌসুমে জেলায় আলুর উৎপাদন ছিল ব্যাপক। উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপর। ফলে কৃষকরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না।

একই চিত্র দেখা গেছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলাতেও। সেখানকার কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাজারে চাহিদা কম থাকায় দাম কমে গেছে। এ অবস্থায় অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন করতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ আলু বের করে বাজারে বিক্রি করলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ বাদ দিয়ে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ফুলবাড়ীতে প্রতি ৬২ কেজি ওজনের এক বস্তা আলুতে উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ মিলিয়ে প্রায় ৪৬০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। উপজেলার বারাইপাড়া গ্রামের মকছেগ আলী, আমড়া গ্রামের রশিদ মণ্ডল ও খড়মপুর গ্রামের আবদুল মালেকসহ কয়েকজন কৃষক জানান, হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করতে গেলে বস্তাপ্রতি প্রায় ৪৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ফলে আলু বিক্রি করেও কৃষকের হাতে লাভের বদলে দেনা বাড়ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে ফুলবাড়ী উপজেলায় ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার ২৫০ টন। এত বিপুল উৎপাদনের পর বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি না হওয়ায় কৃষকদের এখন সংরক্ষিত আলু নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে আমন মৌসুম শুরু হওয়ায়। এ সময় জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি দিতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। সাধারণত হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করে অনেক কৃষক আমন চাষের খরচ জোগাড় করেন। কিন্তু এবার আলুর দাম কম থাকায় সেই অর্থ হাতে আসছে না। ফলে একদিকে হিমাগারে কৃষকের মূলধন আটকে আছে, অন্যদিকে নতুন ফসলের চাষাবাদ চালাতে তাদের বাড়তি ঋণ বা ধার করতে হচ্ছে।

আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। ফুলবাড়ী পৌরবাজারের ব্যবসায়ী বিধান দত্ত ও জয়ন্ত সাহা জানান, বিভিন্ন বাজারে আলু পাঠিয়েও তারা লাভ করতে পারছেন না। কোথাও কোথাও প্রতি ট্রাকে কয়েক হাজার টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে আলু কেনাবেচায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ব্যবসায়ীরা বাজারে সক্রিয় না থাকলে কৃষকদের কাছ থেকেও আলু কেনার পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক—তিন পক্ষই চাপের মধ্যে পড়েছেন। আলু উত্তোলন ও বিক্রি কমে গেলে হিমাগারে দীর্ঘ সময় পণ্য সংরক্ষণ করতে হয়। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের কারণে আলু তুলতে না চাইলে হিমাগারের জায়গাও আটকে থাকে। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাতেই এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ বলেন, উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল রাখা এবং কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত আলুর ন্যায্য বা যৌক্তিক মূল্য পান, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

কৃষকদের মতে, আলুর বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে উৎপাদনের সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনারও সমন্বয় জরুরি। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে সংরক্ষণ, বিকল্প বাজার সৃষ্টি ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর মতো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে কৃষকদের লোকসানের ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ মাঠে ফলন ভালো হলেও যদি সেই ফসলের ন্যায্য দাম না মেলে, তাহলে উৎপাদন খরচ তুলতেই কৃষকের হিমশিম খেতে হয়।

জয়পুরহাট ও ফুলবাড়ীর কৃষকদের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি পণ্যের বাজারদর কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদ। হিমাগারে রাখা আলু দ্রুত ও ন্যায্য দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি না হলে কৃষকের আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে পুরোনো আলুর সরবরাহ, নতুন মৌসুমের আগাম আলু এবং ভোক্তাদের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না এলে দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত