প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল জাতীয় সংসদে পাসের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, জনমতের যথাযথ প্রতিফলন না ঘটিয়ে সরকার এসব আইন পাস করেছে। একই সঙ্গে অতীতে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নতুন আইনগুলোর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরের বিজয়-৭১ চত্বরে আয়োজিত এই বিক্ষোভ সমাবেশে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছেন, ভবিষ্যতে তারাও ক্ষমতার বাইরে যেতে পারেন। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীনদের জন্যই সংকট তৈরি করতে পারে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, উন্নত ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রত্যাশা তৈরি করে শেষ পর্যন্ত জনগণকে হতাশ করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা থাকলেও নতুন আইনে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যারা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদেরও একদিন ক্ষমতার বাইরে যেতে হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার নিয়ে প্রণীত আইন ভবিষ্যতে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জন্যই বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।
সমাবেশে মজিবুর রহমান মঞ্জু বিশেষভাবে গুমের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার মতে, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই একই বাহিনীর হাতে তদন্তের দায়িত্ব থাকা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। এ কারণে গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে যেন কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব কাজ না করে, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অতীতে গুমের বহু অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগের দায় স্বীকার করেনি। ফলে গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। নতুন আইনের কিছু বিধান ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে জটিলতা ও বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। বিশেষ করে দান করা সম্পত্তি পরবর্তী সময়ে বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, শুধু আইন পাস করলেই মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হয় না; আইনের প্রয়োগ কতটা স্বাধীন, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি তিনটি আইন পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান। একই সঙ্গে আইনগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব না থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন।
সমাবেশে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে যারা রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে গেছেন।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিরোধী মতের মানুষ নির্যাতন, গুম, গুলি ও ক্রসফায়ারের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, এসব ঘটনার ইতিহাস ভুলে গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে সমালোচনা করে বলেন, ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইনের কাঠামো আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। তার বক্তব্য, পুরোনো কোনো আইন ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হলে তার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতাগুলোও পর্যালোচনা করা উচিত।
এ সময় তিনি বর্তমান সংসদ ও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও রাজনৈতিক সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং অতীতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। তবে এসব বক্তব্য ছিল এবি পার্টির নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আরও বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনশীল। আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছেন, ভবিষ্যতে তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইন এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের পরিবর্তনের সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে না যায়।
বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন। এতে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম, আলতাফ হোসেন ও শাহাদাতুল্লাহ টুটুলসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন এবং উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাদের মতে, কোনো অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে তদন্তের ফলাফল নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষ, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও ভুক্তভোগীদের মতামত নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিষয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং অধিকারকর্মীরা গুমের অভিযোগ তুলে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নও রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এবি পার্টির বুধবারের সমাবেশে সেই পুরোনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে। দলটির নেতাদের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয়ে উদ্বেগ উঠে আসে—গুমের অভিযোগের তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে, মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম কতটা কার্যকর ও নিরপেক্ষ হবে এবং সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত নতুন বিধান ভবিষ্যতে কী ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
দলটির নেতারা মনে করেন, রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পরিবর্তনের পরও সেগুলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় কার্যকর থাকে। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এবি পার্টির নেতারা সরকারকে পাস করা আইনগুলো পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, জনমত ও নাগরিক অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে আইনগুলো আরও কার্যকর, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও যাতে মানবাধিকার সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অটুট থাকে, সে বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।