জমি দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনে কঠোর হচ্ছে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২২ বার
জমি দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনে কঠোর হচ্ছে সরকার

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি দখল, অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন এবং ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বালুমহাল পরিচালনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সরকার। ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, দেশের স্বার্থে জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩২-এর সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপনের উত্থাপিত জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে ভূমিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জমি দখল ও প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেবে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ রয়েছে, সরকারের এই অবস্থান সেই উদ্বেগ নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জমি মানুষের কাছে শুধু একটি সম্পদ নয়, অনেক পরিবারের কাছে এটি তাদের জীবিকা, বসতভিটা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। ফলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জবরদখলের কারণে জমির মালিকানা ও ভোগদখল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। জমি-সংক্রান্ত বিরোধের দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় সামাজিক বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং পারিবারিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংসদে বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক চর্চা এবং দেশ শোষণের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি ‘দরবেশ বাবা’, ‘ভূমি বাবা’সহ বিভিন্ন পরিচয়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্নভাবে দেশের সম্পদ ও স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়নের ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে। জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, সরকারি ও খাসজমি রক্ষা এবং দখলমুক্ত জমি যথাযথভাবে সংরক্ষণে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

ভূমিমন্ত্রী সংসদে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলন নিয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বালু ও মাটি উত্তোলন, বিপণন, পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করতে সরকার ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ সংশোধন করে বালু ও মাটি উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট নিয়ম ও অনুমোদনের আওতায় বালু ও মাটি উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে কিংবা অনুমোদনের বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারণ অপরিকল্পিতভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন শুধু সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করে না, অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ, নদী, কৃষিজমি এবং স্থানীয় জনজীবনের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে অভিযান চালানোর তথ্যও সংসদে তুলে ধরেন ভূমিমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২ হাজার ৬১৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৩ হাজার ৯৭৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার তথ্য জানানো হয়।

এসব অভিযানের আওতায় ৪ হাজার ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে ১ হাজার ২১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ২২ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি আর্থিক জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে সংসদে জানান ভূমিমন্ত্রী। সরকারি এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

তবে শুধু অভিযান ও জরিমানা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন পরিবেশ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা। কোথায় বালু উত্তোলন করা যাবে, কতটুকু উত্তোলন পরিবেশগতভাবে সহনীয় এবং কোন এলাকায় উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ইজারা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশগত ঝুঁকি, নদীর গতিপথ, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পরিবেশবিদদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে নদী ও জলাশয়ের পানির স্বচ্ছতা নষ্ট হতে পারে। নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ ও মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়তে পারে। অনেক এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি নদী, কৃষি ও জলজ সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় পরিবেশের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন বা তীরবর্তী এলাকার স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও বসতভিটা, কৃষিজমি কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনায় সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অভিযোগ দ্রুত যাচাই ও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

জমি দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলন—দুটি বিষয়ই মূলত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একদিকে জমির মালিকানা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বালু ও মাটির প্রয়োজন থাকলেও সেই উত্তোলন যেন পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, জমি দখলদার ও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত কঠোর অবস্থান মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। একই সঙ্গে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে যেন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় এবং কোনো ধরনের প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার কারণে কেউ ছাড় না পায়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।

ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কারণ জমি হারানো একটি পরিবারের জন্য যেমন বড় ক্ষতি, তেমনি নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া একটি পুরো এলাকার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তাই শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং মানুষের সম্পদ, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা রক্ষার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এখন এসব ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত