পুলিশ হেফাজতে নারীর মৃত্যু, স্বামীর অভিযোগ নির্যাতনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৮ বার
পুলিশ হেফাজতে নারীর মৃত্যু, স্বামীর অভিযোগ নির্যাতনের

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় পুলিশ হেফাজতে থাকা নাদিরা বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার আদালতে নেওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসা শুরুর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে নিহত নারীর স্বামী এনামুল হক গাজীর অভিযোগ, পুলিশ তার স্ত্রীকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে বাড়ি থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে পুলিশের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নাদিরা বেগমকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারের সময় তিনি ইয়াবা গিলে ফেলেছিলেন। অন্যদিকে স্বামীর দাবি, একটি পুরোনো মামলার প্রেক্ষাপটে তাকে আটক করতে গিয়ে পুলিশ বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে থানায় নিয়ে যায়। পরে সেখানেই তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় নাদিরা বেগমকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের সময় তিনি ইয়াবা গিলে ফেলেন। এরপর তার পাকস্থলী পরিষ্কার করার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি।

পুলিশের দাবি, পরে তাকে আদালতে নেওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। ঠিক কী কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল, তা ময়নাতদন্ত ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নাদিরা বেগম বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের কৃষ্ণকাঠি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক গাজী ওরফে মন্টু মেম্বারের স্ত্রী। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজন নারীর মৃত্যু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বসহকারে তদন্তের দাবি উঠেছে।

নাদিরার স্বামী এনামুল হক গাজী পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার অভিযোগ, পুলিশ তার স্ত্রীকে মারধর ও নির্যাতন করে হত্যা করেছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনার পর তাকে থানায় ডাকা হলেও স্ত্রীকে দেখার বা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার সুযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এনামুল হক গাজীর আরও অভিযোগ, বাড়ি থেকে গরু বিক্রির এক লাখ ১৯ হাজার ৫৫০ টাকা, একটি সোনার চেইন, আংটি এবং মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশও এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।

নিহতের স্বামী জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম রেজার সঙ্গে তার জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ওই মামলার পরোয়ানায় তাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ বাড়িতে যায়। তবে তাকে না পেয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এনামুল হক গাজীর অভিযোগ, তার স্ত্রীকে একটি পক্ষের হয়ে পুলিশ নির্যাতন করেছে। এমনকি থানায় তাকে খাবার দিতেও দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। পরে স্ত্রীকে হত্যার পর তাকে থানায় ডাকা এবং কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এ ঘটনায় মামলা করার কথা জানিয়েছেন নিহতের স্বামী।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। বরং জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবা বিক্রির ১৯ হাজার ৫৪০ টাকা এবং তিনটি মোবাইল ফোনসহ নাদিরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থাৎ তাকে কীভাবে এবং কোন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তা নিয়েও নিহতের পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আদালত পুলিশের কর্মকর্তার বক্তব্য। আদালত পুলিশের পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আদালতে আনার আগেই পথে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি কোন মামলায় আসামি ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবগত ছিলেন না বলেও জানিয়েছেন।

বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আদিল হোসেন জানিয়েছেন, নিহত নারীর মরদেহ বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করার কথা রয়েছে। এরপর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রতিবেদনই নাদিরা বেগমের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল কি না, অসুস্থতার প্রকৃতি কী ছিল এবং পুলিশ হেফাজতে থাকার সময় তার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুলিশ হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কারণ হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর থাকে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটির নিরপেক্ষ তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে প্রকৃত ঘটনাটিও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা জরুরি।

এ ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন নারী কীভাবে পুলিশের হেফাজতে গেলেন, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, কখন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং হাসপাতালে নেওয়ার আগেই বা চিকিৎসার সময় তার কী অবস্থা ছিল—এসব বিষয় নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।

একই সঙ্গে নিহত নারীর পরিবারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। বাড়ি থেকে টাকা, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন নেওয়ার অভিযোগ সত্য কি না, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় তদন্ত হওয়া দরকার। কারণ মৃত্যুর ঘটনার পাশাপাশি এসব অভিযোগও ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ঘটনায় কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের দাবি এবং পরিবারের অভিযোগ—দুই দিকই তদন্তের আওতায় এনে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, থানার নথি, গ্রেপ্তারসংক্রান্ত কাগজপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা, চিকিৎসা নথি এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পর্যালোচনা করলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

নাদিরা বেগমের মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি পুলিশি হেফাজতে নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। একটি পরিবারের অভিযোগ যেন উপেক্ষিত না হয়, আবার তদন্তের আগেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ীও করা না হয়—ন্যায়বিচারের স্বার্থে দুই দিকেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও পরবর্তী তদন্তে যদি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে, তাহলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে নিহত নাদিরা বেগমের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায় এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য যেন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত