চিন্ময়ের মায়ের মৃত্যু, শেষ দেখা হলো না ছেলের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ বার
চিন্ময়ের মায়ের মৃত্যু, শেষ দেখা হলো না ছেলের

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা সন্ধ্যা রানী ধর আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মায়ের অসুস্থতার খবর পাওয়ার পরও কারাগারে থাকা ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস তার সঙ্গে শেষবার দেখা করার সুযোগ পাননি। মৃত্যুর আগে অসুস্থ সন্ধ্যা রানী ধর নিজেই ছেলের আশ্রমে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেই ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে হাটহাজারীর পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে নেওয়া হয়। সেখানেই জীবনের শেষ সময় কাটান তিনি।

সন্ধ্যা রানী ধর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার কথা জানা যায়। তবে হাসপাতালের পরিবেশে থাকতে তিনি স্বস্তি বোধ করছিলেন না। শেষ সময়ে ছেলের সঙ্গে সম্পর্কিত আশ্রমেই থাকতে চেয়েছিলেন তিনি।

পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় সন্ধ্যা রানী ধর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। ছেলের অসুস্থতার খবর, একের পর এক জামিন আবেদন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার বিষয়টি তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে রেখেছিল। একজন মায়ের কাছে সন্তানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি যে কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, তার শেষ সময়ের পরিস্থিতিতে সেই মানবিক দিকটিই সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে।

মাকে দেখতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পরিবারের পক্ষ থেকে বুধবার প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছিল। তার বড় ভাই রঞ্জন কুমার ধর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও কারা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছে এ আবেদন করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে অসুস্থ মাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসুস্থ স্বজনকে দেখতে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ নেই। স্বজন মারা গেলে প্যারোলের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

এর পরদিনই সন্ধ্যা রানী ধরের মৃত্যু হলো। ফলে যে মা শেষ সময়ে ছেলেকে কাছে পেতে চেয়েছিলেন এবং যে ছেলে অসুস্থ মায়ের পাশে থাকার সুযোগ চেয়েছিলেন, তাদের সেই শেষ সাক্ষাৎ আর হয়ে উঠল না। এই ঘটনা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পরিবার ও তার অনুসারীদের মধ্যে গভীর আবেগ ও শোকের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন। জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে ওই বছরের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় তারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটিতে বাদী ছিলেন চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও-মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান।

ওই মামলায় ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার কাছ থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাকে চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করা হলে জামিন আবেদন নাকচ করা হয়। এরপর আদালত এলাকায় তার অনুসারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষ ও উত্তেজনার মধ্যে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন।

সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনায় তার বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে তদন্তের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই মামলায়ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এছাড়া হামলা, হত্যাচেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে করা আরও কয়েকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে সাম্প্রতিক সময়ে জামিনও পেয়েছেন তিনি। গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট দুটি মামলায় তাকে জামিন দেন। এর আগে আরও কয়েকটি মামলায় জামিন পাওয়ার কথা জানা যায়। তবে অন্যান্য মামলা চলমান থাকায় তিনি কারামুক্ত হতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় জামিনের বিষয়েও আইনি জটিলতা রয়েছে। একই সঙ্গে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রমও চলমান।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কারাবন্দিত্বের পুরো সময়জুড়েই তার পরিবারকে নানা ধরনের আইনি ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে মায়ের অসুস্থতা এবং শেষ সময়ে ছেলের কাছে থাকার আকাঙ্ক্ষা বিষয়টিকে আরও মানবিক ও স্পর্শকাতর করে তুলেছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে শেষ মুহূর্তে প্যারোলের আবেদন করা হলেও সেই সুযোগ না পাওয়ার পরই আসে তার মৃত্যুর খবর।

সন্ধ্যা রানী ধরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে চলমান দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়ও সামনে এসেছে। একজন মা অসুস্থ অবস্থায় ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন, আর ছেলে ছিলেন কারাগারের বাইরে যেতে আইনি বাধ্যবাধকতায় আটকে। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে ছেলের উপস্থিতি ছাড়াই।

মৃত্যুর আগে পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে থাকার যে ইচ্ছা সন্ধ্যা রানী ধর প্রকাশ করেছিলেন, সেটিই তার শেষ ইচ্ছাগুলোর একটি হয়ে রইল। আশ্রমেই তার জীবনের শেষ সময় কেটেছে। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অনুসারীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

একজন মায়ের জীবনের শেষ আকাঙ্ক্ষা ছিল ছেলের কাছাকাছি থাকা। কিন্তু দীর্ঘ কারাবাস ও চলমান মামলার কারণে সেই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পেল না। সন্ধ্যা রানী ধরের মৃত্যুর পর এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন—দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কি মায়ের শেষকৃত্য ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে পরিবার ও তার অনুসারীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত