রিপাবলিকান জিতলে ৫ হাজার ডলার দেবেন ট্রাম্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
রিপাবলিকান জিতলে ৫ হাজার ডলার দেবেন ট্রাম্প

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে দেশটির প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প এই অর্থকে ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তীকালীন সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ী হলে শুধু দলই নয়, ভোটাররাও লাভবান হবেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় হলে প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানরা ৫ হাজার ডলার করে পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দিতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। দেশটির জনসংখ্যা এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এ কর্মসূচির মোট ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। ফলে এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, কীভাবে বিতরণ করা হবে এবং এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে কি না—এসব প্রশ্ন ইতোমধ্যে সামনে এসেছে।

ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর প্রশাসনের শুল্কনীতি থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর আরোপ করা শুল্ক থেকে যে অর্থ রাজস্ব হিসেবে আসছে, তার একটি অংশ ব্যবহার করে নাগরিকদের অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

তবে প্রস্তাবিত ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে, তা শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাজেট ঘাটতি ও জাতীয় ঋণের পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের সরাসরি অর্থপ্রদান কীভাবে করা হবে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রস্তাবটির বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ৫ হাজার ডলারের এই অর্থ দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। বিশেষ করে ধনী ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা সামনে আসে।

ভ্যান্স শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্বের সঙ্গে এই অর্থপ্রদানের পরিকল্পনার সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন। তবে পুরো পরিকল্পনার কাঠামো, কারা যোগ্য হবেন, অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে এবং আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি।

হোয়াইট হাউসের কাছে ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে এখনো একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বাজেটসংক্রান্ত প্রক্রিয়া কী হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বর্তমানে বড় ধরনের ঋণ ও বাজেট ঘাটতির চাপ রয়েছে। দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এরই মধ্যে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে নাগরিকদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণের ঘোষণা অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অর্থনীতিবিদদের একটি উদ্বেগ হলো, সরকারের পক্ষ থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া হলে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার ভারসাম্য ঠিক না থাকলে এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে পারে। যদিও প্রস্তাবটি এখনো বিস্তারিত নীতিতে রূপ নেয়নি, তাই এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

ট্রাম্প অবশ্য এর আগেও সাধারণ নাগরিকদের অর্থ দেওয়ার ধারণার কথা বলেছেন। চলতি বছরের শুরুতে তিনি ২ হাজার ডলারের একটি ‘ডিভিডেন্ড’ দেওয়ার প্রস্তাবের কথা জানিয়েছিলেন। তখনও এই অর্থপ্রদান বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য ১ হাজার ৭৭৬ ডলারের একটি অর্থপ্রদান করা হয়েছিল। ট্রাম্প সেই অর্থকে ‘ওয়ারিয়র ডিভিডেন্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এবার সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জন্য ৫ হাজার ডলারের প্রস্তাব সেই আগের উদ্যোগের তুলনায় অনেক বড় পরিসরের।

রিপাবলিকান দলের মধ্যবর্তী নির্বাচনী প্রচারণার সময় এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জন্য কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা ও নীতির প্রতি ভোটারদের মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা চাপের মুখে রয়েছে। সিনেটেও দলটির অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে নভেম্বরের নির্বাচন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প নিজেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের আসন হারানোর প্রচলিত প্রবণতা পরিবর্তন করতে চান বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকে তিনি নিজের প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

এই পরিস্থিতিতে ৫ হাজার ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ ঘোষণাকে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের কাছে সরাসরি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তাদের আর্থিক স্বস্তি দেওয়ার আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের মধ্যে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে একই সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতির অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। ৫ হাজার ডলার করে অর্থ দিতে হলে সরকারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। জাতীয় ঋণ ও বাজেট ঘাটতির পাশাপাশি এ অর্থের উৎস নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো ইতোমধ্যে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর দ্রুত ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিল প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর এই অবস্থান প্রস্তাবটিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে আইন প্রণয়নের আলোচনায় নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা আগের কিছু রাজনৈতিক ঘটনার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। গত বছর উইসকনসিনের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধনকুবের ইলন মাস্ক ভোটারদের মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ করেছিলেন। নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে নিতে তাঁর এই উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হন।

ট্রাম্পের প্রস্তাবের সঙ্গে ওই ঘটনার সরাসরি তুলনা করা না গেলেও নির্বাচনের আগে ভোটারদের অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ব্যবহার করে ভোটারদের সরাসরি অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা হলে তার আইনগত কাঠামো এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের প্রস্তাব তাঁর প্রথম মেয়াদে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নাগরিকদের দেওয়া সরকারি সহায়তার তুলনায়ও বড়। মহামারির সময়ে লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক সরাসরি সরকারি অর্থ সহায়তা পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার আরও বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

তবে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে। সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অর্থ পাবেন, নাকি নির্দিষ্ট আয়ের সীমার মধ্যে থাকা নাগরিকরা এই সুবিধা পাবেন—এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কাঠামো সামনে আসেনি। একইভাবে অর্থপ্রদানের সময়, যোগ্যতার শর্ত এবং অর্থের উৎস সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

নির্বাচনের আগে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে মার্কিন রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে। রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করার চাপ তৈরি হতে পারে। আর যদি দলটি নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পায়, তাহলে এই প্রতিশ্রুতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে ৫ হাজার ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে এটি ভোটারদের সরাসরি আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ, বাজেট ঘাটতি, শুল্ক রাজস্ব ও মূল্যস্ফীতির মতো বড় অর্থনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নভেম্বরের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও তত বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত