১০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
১০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। ফলে একদিকে যেমন এসব ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। সহজভাবে বললে, ব্যাংকগুলো যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা বর্তমানে অনাদায়ি বা খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

শুধু তিন মাসের ব্যবধানেই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা এখনো বড় ধরনের সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ অনুমোদনে দুর্বলতা, বেনামি ঋণ এবং ঋণ ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর আগের তুলনায় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফলে এত দিন আড়ালে থাকা কিছু অনিয়ম ও ঋণের তথ্যও সামনে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিমাণ অতীতের তুলনায় কতটা ভয়াবহ, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় সেই খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা যাচাই ও প্রকৃত হিসাব প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের পর্যালোচনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সম্পদ, ঋণ ও আর্থিক দুর্বলতার বিভিন্ন দিক সামনে আসে। একই সঙ্গে ঋণ শ্রেণীকরণের নীতিমালায় পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের কারণে খেলাপি ঋণের হিসাবও আগের তুলনায় বাস্তব চিত্রের কাছাকাছি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে কয়েকটি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ছিল শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের। মোট ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে এই পরিমাণ প্রায় ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বড় অংশই কয়েকটি ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে রয়েছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও মালিকানা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের একটি বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশই এখন খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকটি যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে, তার বড় একটি অংশ নিয়মিতভাবে ফেরত আসছে না।

জনতা ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ এবং এননটেক্সের মতো বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নাম রয়েছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ অনাদায়ি হয়ে পড়ায় ব্যাংকটির ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।

তবে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে একীভূত কয়েকটি ব্যাংক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। ইউনিয়ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

এসব ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা ও সিকদারসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নাম রয়েছে। এত বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি। বড় ঋণখেলাপিদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ফলে শুধু বেসরকারি ব্যাংক নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ব্যাংকারদের মতে, বড় ঋণখেলাপিদের একটি অংশ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অনেক ঋণগ্রহীতা দেশে নেই বা বিভিন্ন আইনি জটিলতায় রয়েছেন। ফলে ব্যাংকগুলো চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ঋণ আদায় করতে পারছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে যে সম্পদ বন্ধক রাখা হয়েছিল, তার প্রকৃত মূল্য এবং আইনি মালিকানা নিয়েও জটিলতা রয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু ঋণ পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। কারণ, কাগজে-কলমে ঋণের শ্রেণীকরণ পরিবর্তন করা গেলেও প্রকৃত অর্থ ফেরত না এলে ব্যাংকের তারল্য ও মূলধনের ওপর চাপ থেকেই যায়।

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে পুনঃতফসিল ও এককালীন পরিশোধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশকে ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করা এবং ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থের কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করা। তবে বড় ঋণখেলাপিদের একটি অংশ এসব সুযোগ গ্রহণ করলেও সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না।

ব্যাংকারদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মইনউদ্দীনের বক্তব্যেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ছোট অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে কঠোরতার মুখোমুখি হতে হলেও বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন।

তিনি আরও মনে করেন, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা এককালীন পরিশোধের সুযোগ দিয়ে বড় খেলাপিদের সমস্যা সমাধান করা কঠিন। যেসব অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। ব্যাংকের অর্থ ফেরত না এলে কাগজে ঋণের হিসাব পরিবর্তন করলেও ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ফিরবে না।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খানও দ্রুত ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেসব ঋণগ্রহীতা কোনোভাবেই ঋণ পরিশোধে সাড়া দিচ্ছেন না, তাদের ঋণ একটি বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এরপর ওই ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ বিক্রি করে যতটা সম্ভব অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালান্সশিট থেকে বিপুল পরিমাণ অনাদায়ি ঋণের চাপ কিছুটা কমাতে পারবে। পাশাপাশি যেসব ব্যবসা এখনো পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখে, সেগুলোকেও নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সচল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু ব্যাংক বা ঋণগ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারী ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে। ব্যাংকের অর্থের বড় অংশ আসে সাধারণ মানুষের আমানত থেকে। সেই অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণের পর ফেরত না এলে ব্যাংকের তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। এতে নতুন ঋণ বিতরণ কমে যেতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে তার চাপ পড়তে পারে রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর। আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হলে মানুষ ব্যাংকে অর্থ রাখা বা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন। ফলে খেলাপি ঋণ সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব ব্যাংকিং খাত ছাড়িয়ে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্ত করা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং যত দ্রুত সম্ভব অর্থ পুনরুদ্ধার করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে যাচাই-বাছাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ বন্ধ করাও জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু নতুন নিয়ম বা ছাড় ঘোষণা করলেই ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে অর্থ ফেরত পাওয়া পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা কিংবা প্রভাবের সুযোগ বন্ধ করে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে সবাইকে আনতে হবে।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আর কোনো একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাত্র ১০টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হওয়া পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই বড় সতর্কসংকেত। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

অন্যদিকে, কঠোরতার পাশাপাশি সৎ ও সক্ষম ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণপ্রাপ্তির সুযোগও স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন। কারণ খেলাপি ঋণ কমানোর নামে যদি বৈধ ব্যবসা ও বিনিয়োগে ঋণের প্রবাহ কমে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত একদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যদিকে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের জন্য যৌক্তিক পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক সংকট এবং আমানতকারীদের আস্থা—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন শুধু সাময়িক সুবিধা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, কঠোর তদারকি, দ্রুত ঋণ আদায় এবং আর্থিক অপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এসব পদক্ষেপ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপরই দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত