ড্রোন আতঙ্কে জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রায় বিলম্ব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
ড্রোন আতঙ্কে জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রায় বিলম্ব

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বহনকারী একটি বিমানের নরওয়ের উদ্দেশে যাত্রা মলদোভার আকাশসীমায় ড্রোন সতর্কতার কারণে বিলম্বিত হয়েছে। রাশিয়ার দুটি ড্রোন মলদোভার আকাশসীমায় প্রবেশের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশটির আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেলেনস্কির বিমানসহ ওই সময়ে আরও কয়েকটি বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে সমস্যার মুখে পড়ে।

মলদোভা সরকারের এক মুখপাত্র বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মলদোভার ভূখণ্ডে রাশিয়ার একটি ড্রোন নেমে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর জেলেনস্কিকে বহনকারী বিমানটিকে উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়। এর আগে ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে দেশটির আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

মলদোভার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোট তিনটি বিমান উড্ডয়নে এবং চারটি বিমান অবতরণে বিলম্বের মুখে পড়ে। আকাশসীমায় অজ্ঞাত বা শত্রুভাবাপন্ন ড্রোনের উপস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি থাকায় বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী ও প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। মলদোভা সরাসরি যুদ্ধের অংশ না হলেও ইউক্রেনের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত রয়েছে। ফলে ইউক্রেনের আকাশ ও স্থলভাগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত সামরিক তৎপরতার প্রভাব মাঝেমধ্যেই মলদোভার ভূখণ্ড ও আকাশসীমায় পড়ছে।

মলদোভার কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার দুটি ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। এর মধ্যে একটি রাজধানী চিসিনাউয়ের উত্তরে একটি মাঠে গিয়ে পড়ে। ড্রোনটি মাটিতে আছড়ে পড়ার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। অন্য একটি ড্রোন মলদোভার আকাশসীমা অতিক্রম করে প্রতিবেশী রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে।

ড্রোন দুটি কীভাবে মলদোভার আকাশসীমায় প্রবেশ করল এবং সেগুলোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কী ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঘটনাটি দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মলদোভার আকাশসীমা নিয়েও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।

মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু দেশটির আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এ ধরনের ঘটনা মানুষের জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের সঙ্গে মলদোভার সীমান্তের একটি স্থলপথে রাশিয়ার ড্রোন হামলারও নিন্দা জানান তিনি। ওই হামলায় দুজন নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

ড্রোন সতর্কতার ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরে বুধবার দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মলদোভা থেকে উড্ডয়নের আগে জেলেনস্কিকে বহনকারী বিমানটি একটি ড্রোনের হামলার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।

স্টোরের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলেনস্কি যে ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, ঘটনাটি তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। তবে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী তার এই তথ্যের নির্দিষ্ট উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। ড্রোনটি জেলেনস্কিকে বহনকারী বিমানের ঠিক কতটা কাছ দিয়ে গিয়েছিল বা বিমানটি কীভাবে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়িয়ে উড্ডয়ন করেছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ফলে জেলেনস্কির বিমানটি সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার উপক্রম হয়েছিল কি না, নাকি আকাশসীমায় ড্রোন শনাক্ত হওয়ার কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় উড্ডয়ন বিলম্বিত করা হয়েছিল—এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। মলদোভা সরকারের বিবৃতিতে মূলত আকাশসীমা বন্ধ রাখা এবং ড্রোন শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জেলেনস্কির বিমানের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফর সাধারণত কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জেলেনস্কির বিদেশ সফরগুলোতে বিমান চলাচল, আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমায় সামরিক ড্রোনের উপস্থিতি সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে।

এদিকে ড্রোন সতর্কতার কারণে যাত্রায় বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত নরওয়েতে পৌঁছাতে সক্ষম হন জেলেনস্কি। নরওয়ের রাজধানী অসলোয় তিনি দেশটির রাজা হারাল্ড পঞ্চমের শেষকৃত্যে অংশ নেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতায় জেলেনস্কি অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে রাজপরিবারের সদস্যদের পেছনে হেঁটে কফিনের দিকে এগিয়ে যান। ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেও তার এই সফর ছিল কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়ে ইউক্রেনের অন্যতম সহযোগী দেশ হিসেবে দেশটির প্রতি রাজনৈতিক ও মানবিক সমর্থন দিয়ে আসছে।

রাজা হারাল্ড পঞ্চমের শেষকৃত্য শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই নরওয়ে ত্যাগ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। সফরটি স্বল্প সময়ের হলেও এর শুরুতে মলদোভার আকাশসীমায় ড্রোন সতর্কতার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

মলদোভায় ড্রোন প্রবেশের ঘটনা দেশটির জন্যও নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা দেশগুলোর আকাশসীমায় সামরিক ড্রোনের প্রবেশ শুধু বিমান চলাচলকে বিঘ্নিত করছে না, একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একটি ড্রোন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আছড়ে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে মলদোভার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জেলেনস্কির নরওয়ে যাত্রায় সাময়িক বিলম্ব তাই শুধু একটি বিমান চলাচল-সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে আশপাশের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে, এই ঘটনা তার আরেকটি উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফরেও যুদ্ধের নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত নিরাপদে নরওয়েতে পৌঁছে নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিলেও জেলেনস্কির যাত্রাপথে ড্রোন সতর্কতার ঘটনা ইউরোপের আকাশসীমার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবের মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো কীভাবে সেই ঝুঁকি মোকাবিলা করবে—এ বিষয়টি আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত