এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে ইয়ামালের নতুন ইতিহাস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে ইয়ামালের নতুন ইতিহাস

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চে আরও একবার নিজের অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ দিলেন বার্সেলোনার তরুণ স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামাল। নিজেদের মাঠে ফেইনুর্ডের বিপক্ষে বড় ব্যবধানের জয়ের রাতে এক গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে শুধু দলের জয়ে অবদান রাখেননি, একই সঙ্গে গড়ে ফেলেছেন ব্যক্তিগতভাবে নতুন এক ইতিহাস। টুর্নামেন্টে টিনেজার হিসেবে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে তিনি পেছনে ফেলেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে।

ফেইনুর্ডের বিপক্ষে বার্সেলোনার ৫-১ গোলের জয়টি ছিল পুরোপুরি আধিপত্যপূর্ণ। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কাতালান ক্লাবটি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ওপর একের পর এক চাপ তৈরি করে বার্সেলোনা। সেই আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইয়ামাল। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তার কার্যকর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট।

ম্যাচে ইয়ামাল দুটি অ্যাসিস্ট করেন এবং নিজেও একটি গোল করেন। এই পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টিনেজার হিসেবে তার গোল ও অ্যাসিস্টের সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩-এ। এই পরিসংখ্যানই তাকে নিয়ে এসেছে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত রেকর্ডের কেন্দ্রে।

এর আগে টিনেজার হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ২০টি অবদানের রেকর্ড ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পের দখলে। রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা হিসেবে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজের অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বয়স কম থাকতেই ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতায় তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

সেই রেকর্ডই এবার ছাড়িয়ে গেলেন ইয়ামাল। মাত্র কিশোর বয়সেই ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্লাব প্রতিযোগিতায় ২৩টি গোল-অ্যাসিস্ট অবদান তার প্রতিভার ব্যাপ্তি সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় এত অল্প বয়সে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর পারফরম্যান্স করা যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বড় অর্জন।

ইয়ামালের এই উত্থান অবশ্য এক ম্যাচের গল্প নয়। বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা পাওয়ার পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বয়সে তরুণ হলেও বল পায়ে তার আত্মবিশ্বাস, গতি, ড্রিবলিং, সঠিক সময়ে পাস দেওয়ার ক্ষমতা এবং গোল করার দক্ষতা তাকে অন্য অনেক তরুণ ফুটবলারের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।

ফেইনুর্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিও সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ যখন বার্সেলোনার আক্রমণ সামলাতে ব্যস্ত, তখন ইয়ামাল কখনো ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ তৈরি করেছেন, কখনো ভেতরে ঢুকে সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন। আবার সুযোগ পেলে নিজেও আক্রমণের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। ফলে তার পারফরম্যান্স ছিল শুধু গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো আক্রমণভাগকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান ফুটবলে তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে ইয়ামালের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে তার বয়স এবং অর্জনের গতির কারণে। যে বয়সে অনেক ফুটবলার পেশাদার ফুটবলে নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেন, সেই বয়সেই তিনি বার্সেলোনার মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়ে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে রেকর্ড গড়ছেন।

তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বার্সেলোনার সমর্থকদের মধ্যে তাকে ঘিরে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ক্লাবটির দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি খেলোয়াড় উঠে এসেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই অল্প বয়সে প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে তার বর্তমান সাফল্যের সঙ্গে অতীতের কিংবদন্তিদের সরাসরি তুলনা না করে, তাকে নিজের গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ফুটবলে প্রতিভার পাশাপাশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা। ইয়ামাল ইতোমধ্যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেই পারফরম্যান্সকে বছরের পর বছর ধরে ধরে রাখা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ইতোমধ্যে ইয়ামাল নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তরুণ বয়সেই স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নেমেছেন এবং বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন। বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও তার ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে। ফলে ক্লাব ফুটবল ও আন্তর্জাতিক ফুটবল—দুই ক্ষেত্রেই তার সামনে বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে।

এরই মধ্যে ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছেন ইয়ামাল। বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতির জন্য মনোনীতদের তালিকায় এত কম বয়সে তার উপস্থিতি তার দ্রুত উত্থানের আরেকটি বড় প্রমাণ। যদিও ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে দলীয় সাফল্যই ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি, তবু ব্যালন ডি’অরের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের আলোচনায় জায়গা পাওয়া একজন তরুণ খেলোয়াড়ের জন্য বিশেষ অর্জন।

এমবাপ্পের রেকর্ড ভাঙার বিষয়টিও তাই ইয়ামালের ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। এমবাপ্পে নিজেও অল্প বয়সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তার সেই রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়া ইয়ামালের জন্য নিঃসন্দেহে বড় মাইলফলক। তবে এই রেকর্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি ইয়ামালের সম্ভাবনার শেষ নয়; বরং সামনে আরও বড় অর্জনের পথ খুলে দিতে পারে।

বার্সেলোনার জন্যও ইয়ামালের এমন পারফরম্যান্স স্বস্তির খবর। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে শুধু অভিজ্ঞ তারকার ওপর নির্ভর করলেই চলে না, প্রয়োজন এমন তরুণ খেলোয়াড়, যারা বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। ইয়ামাল ইতোমধ্যে সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিতে শুরু করেছেন।

ফেইনুর্ডের বিপক্ষে ৫-১ গোলের জয় যেমন বার্সেলোনাকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে, তেমনি ইয়ামালের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স তার নিজের আত্মবিশ্বাসও বাড়াবে। এক ম্যাচে গোল ও দুটি অ্যাসিস্টের মতো পরিসংখ্যান তার সামর্থ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকা একজন তরুণ খেলোয়াড় নন; বরং ম্যাচের গতিপথে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারা একজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেন।

এখন তাই ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন—কোথায় গিয়ে থামবেন লামিন ইয়ামাল? এমবাপ্পের রেকর্ড পেছনে ফেলে তিনি নতুন যে অধ্যায়ের সূচনা করেছেন, সেটি আরও কত দূর এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়। বয়স এখনও তার পক্ষে, সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার। চোট, চাপ ও প্রত্যাশার মতো কঠিন পরীক্ষাগুলো সামলে যদি ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে বর্তমান রেকর্ড ভবিষ্যতে তার আরও বড় অর্জনের কেবল শুরু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে তরুণদের অনেক উজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে। সেই ইতিহাসে এখন নিজের নাম আরও শক্তভাবে লিখে ফেললেন ইয়ামাল। এমবাপ্পের মতো তারকার রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়া তার প্রতিভার স্বীকৃতি হলেও, তার সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হবে এই সাফল্যকে নিয়মিত পারফরম্যান্স ও দলীয় অর্জনে রূপ দেওয়া। বার্সেলোনার জার্সিতে তার প্রতিটি পরবর্তী ম্যাচ তাই শুধু একটি নতুন ম্যাচ নয়, হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ এক তারকার পরবর্তী অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত