সময় থাকতে দেশে ফিরুন, মার্কিন সেনাদের ইরানের হুঁশিয়ারি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
সময় থাকতে দেশে ফিরুন, মার্কিন সেনাদের ইরানের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের দ্রুত দেশে ফিরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। সময় ও সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই মার্কিন সামরিক সদস্যদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি।

বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে এমন সতর্কবার্তা দেন তিনি। তার বক্তব্যে পারস্য উপসাগরকে ঘিরে ইরানের সামরিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নিয়ে তেহরানের কঠোর মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ইব্রাহিম আজিজি বলেন, সুযোগ থাকতেই মার্কিন সেনাদের দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাদের কাছে যে সামরিক সরঞ্জাম এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো নিয়ে ফিরে গিয়ে নিজেদের সীমান্ত রক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ইরানি এই কর্মকর্তা দাবি করেন, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইরান তার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে ইরানের নৌবাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি সামরিক শক্তিগুলোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে তেহরান নিজের অবস্থানকে অত্যন্ত দৃঢ় হিসেবে তুলে ধরছে।

ইব্রাহিম আজিজির বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে সরাসরি দেওয়া সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, অবশিষ্ট মার্কিন বাহিনীর উচিত পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে দেশে ফিরে যাওয়া। তার মতে, বিদেশি সেনাদের পরিবর্তে নিজেদের দেশের সীমান্ত ও নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের।

ইরানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। পারস্য উপসাগর ও এর আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর মন্তব্য এসেছে।

আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি দাবি করেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তার বক্তব্যে মার্কিন বাহিনীর মনোবল, অস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজের পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে।

মোহেব্বির দাবি, অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্বলতার মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি মার্কিন বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইরানি এই সামরিক কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আগ্রাসনের আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান মোতায়েন ছিল। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলে এসব মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা নৌযানের একটিও নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ইরানের এই দাবিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ পারস্য উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি যেমন ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ, তেমনি ইরানও উপসাগরীয় জলসীমায় নিজের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাবকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

দুই পক্ষের বক্তব্যে পারস্য উপসাগরকে ঘিরে নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ইরান একদিকে নিজেদের নৌ সক্ষমতা প্রদর্শনের দাবি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে তেহরান মূলত এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, নিজেদের ভূখণ্ড ও আশপাশের কৌশলগত এলাকায় বিদেশি সামরিক উপস্থিতিকে তারা সহজভাবে মেনে নেবে না।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রকাশ্য বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সতর্ক করা, নিজেদের সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরা এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেওয়া—এসবই আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হতে পারে। ইরানি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও এমন রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তার সমন্বয় দেখা যাচ্ছে।

তবে ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া দাবিগুলোর সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা, তাদের বর্তমান অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তেহরানের বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও একাধিক উৎসের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের অবস্থান নতুন নয়। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব স্থানীয় দেশগুলোর হাতেই থাকা উচিত এবং বাইরের শক্তির সামরিক উপস্থিতি উত্তেজনা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতিকে আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে।

এই দুই ভিন্ন অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগরকে ঘিরে উত্তেজনা সহজেই বড় আকার নিতে পারে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনী, যুদ্ধজাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয় থাকলে ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।

এ অবস্থায় ইব্রাহিম আজিজির ‘সময় থাকতে দেশে ফিরে যান’ মন্তব্যকে শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব ধরা পড়বে না। এর মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া একটি কৌশলগত সতর্কবার্তাও রয়েছে। তেহরান যে পারস্য উপসাগর ও আশপাশের অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই বক্তব্যে।

অন্যদিকে আইআরজিসির মুখপাত্রের বক্তব্য ইঙ্গিত করছে, ইরান তার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং প্রয়োজনে আঞ্চলিক পর্যায়ে সেই সক্ষমতা ব্যবহারের বার্তা দিতে চাইছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্য, সামরিক তৎপরতা এবং কূটনৈতিক অবস্থানের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব যেন আরও বিস্তৃত না হয়, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হলে প্রাণহানি ও মানবিক সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন সেনাদের দ্রুত দেশে ফেরার আহ্বান এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তায় ইরানের সক্ষমতার দাবি পরিস্থিতির উত্তেজনাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই সতর্কবার্তার পর ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়। সেই উত্তরই আগামী দিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত